বাঙালিনিউজ

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হাজার হাজার নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিকে রাতের অন্ধকারে নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। এই বর্বর গণহত্যার বীভৎসতা এতটাই ভয়ঙ্কর ও নৃশংস ছিল যে, একরাতে এতো বেশি মানুষ হত্যার নজির আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ২৫ মার্চ রাতে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ সকল প্রকার ধ্বংসযজ্ঞের নতুন রেকর্ড গড়েছে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী।

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে পাক বাহিনীর এই হত্যাযজ্ঞকে বিশ শতকের পাঁচটি ভয়ঙ্কর গণহত্যার অন্যতম বলে উল্লেখ করেছে।

১৯৮১ সালে জাতিসংঘ সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয় “Among the genocides of human history, the highest number of people killed in lower span of time is in Bangladesh in 1971. An average of 6000 (six thousand) to 12 000 (twelve thousand) people were killed every single day…This is the highest daily average in the history of genocide’s.”

২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিরাপত্তা বিষয়ক আর্কাইভ’ তাদের অবমুক্তকৃত দলিল প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ছিল বিশ্ব সভ্যতা, মানবাধিকার ও মানবতার বিরদ্ধে সবচেয়ে বড় অপরাধ। সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার নির্দেশে, জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে “অপারেশন সার্চলাইট” নামের সামরিক অভিযানে সংগঠিত হয় ইতিহাসের এই জঘন্যতম গণহত্যা।

এশিয়া টাইমসের ভাষ্য, ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনীর বড় বড় অফিসারদের নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। বৈঠকে তিনি বলেন, “ত্রিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা কর, তখন দেখবে তারা আমাদের হাত চেটে খাবে।” ওই বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে মার্চের শুরুতে ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি অপারেশনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান ডয়চে ভেলেকে জানান, বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এই নিধনযজ্ঞের পরিকল্পনা হয়েছিল একাত্তরের মার্চের শুরুতেই, জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাড়ি পাকিস্তানের লারকানায়৷ শিকারের নামে এই গণহত্যার ষড়যন্ত্রে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া এবং জেনারেল হামিদ অন্যতম৷ তাঁরা ভেবেছিলেন, ২০ হাজার মানুষ হত্যা করলেই ভয় পাবে বাঙালিরা, স্বাধীনতা এবং স্বাধিকারের কথা আর বলবে না৷

এরপর ১৭ মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সিওএস জেনারেল হামিদ ঢাকায় টেলিফোন করে মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজাকে অপারেশনের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৮ মার্চ সকালে ঢাকা সেনানিবাসের জিওসি কার্যালয়ে বসে জেনারেল রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি অপারেশনের পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনাটি জেনারেল ফরমান নিজ হাতে হালকা নীল রঙের একটি অফিস প্যাডের ৫ পাতা জুড়ে লিড পেন্সিল দিয়ে লিখে নেন।

জেনারেল ফরমান অপারেশনের সিদ্ধান্ত এবং সাফল্যের কৌশল তৈরি করেন এবং জেনারেল খাদিম সেনাদলের অভিযানের স্থান নির্ধারণ, বিভিন্ন ব্রিগেড ও ইউনিটের উপর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন ইত্যাদি কাজ তদারকি করেন। এ সময় ধারণা করা হয় যে বাঙালি সেনারা অপারেশনের শুরুর সময় বিদ্রোহ করবে, তাই পরিকল্পনাকারীরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলাপকালে বাঙালি সৈন্যদের অপারেশনের পূর্বেই নিরস্ত্র করার এবং বাঙালি রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতারের প্রস্তাব দেন।

‘অপারেশনের সব কিছুই নির্ধারিত হল।’ – হাতে লিখিত পরিকল্পনাটি ২০ মার্চে আবার জেনারেল হামিদ এবং লে. জেনারেল টিক্কা পর্যালোচনা করেন। জেনারেল হামিদ তাৎক্ষণিকভাবে বাঙালি সেনা ইউনিটগুলোকে নিরস্ত্র করার সিদ্ধান্ত নিলেও শুধু ইপিআর, আর্মড পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীদের নিরস্ত্র করার অনুমতি দেন। ইয়াহিয়া খান তার সঙ্গে এক বৈঠকের সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতারের পরিকল্পনা প্রত্যখ্যান করেন। এ সময় পুণঃনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয় এবং বিভিন্ন এলাকার কমান্ডারদের কাছে তা বিতরণ করে দেয়া হয়।

ঢাকার সৈন্যদের কমান্ডে ছিলেন রাও ফরমান আলি এবং অন্যান্য সব স্থানের সৈন্যদের কমান্ডে ছিলেন জেনারেল খাদেম। জেনারেল টিক্কা এবং তার কর্মকর্তারা ৩১তম কমান্ড সেন্টারের সব কিছু তদারকি করা এবং ১৪তম ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে উপস্থিত ছিলেন।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২৪-২৫ মার্চ জেনারেল হামিদ, জেনারেল এ. ও মিঠঠি, কর্নেল সাদউল্লাহ হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন সেনানিবাসে প্রস্ত্ততি পরিদর্শন করেন। সিদ্ধান্ত হয়, ২৫ মার্চ রাত ১টায় অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় অভিযানে ঢাকায় নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল রাও ফরমান আলী।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল খাদিম রাজা। লে. জেনারেল টিক্কা খান ৩১ ফিল্ড কমান্ডে উপস্থিত থেকে অপারেশনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এ ছাড়া এ অভিযানকে সফল করার জন্য ইতোমধ্যে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের দু’জন ঘনিষ্ঠ অফিসার মেজর জেনারেল ইখতেখার জানজুয়া ও মেজর জেনারেল এ.ও মিঠঠিকে ঢাকায় আনা হয়।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ সম্পর্কে পাকিস্তানি পরিকল্পনার কথা জানা যায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে ইস্টার্ন কমান্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক লিখিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থ থেকে। সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ২৫ মার্চ রাজনৈতিক আলোচনার ফলাফল জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন।

২৫ মার্চ সকাল ১১টার দিকে তার সবুজ টেলিফোন বেজে উঠল। লে. জেনারেল টিক্কা খান লাইনে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘খাদিম এটা আজ রাতে’। এ খবর খাদিমের মনে কোনো উন্মাদনার সৃষ্টি করল না, তিনি হাতুড়ির আঘাত পড়ার অপেক্ষায় ছিলেন। খাদিম তার অধীনস্থ মহলে আদেশটি বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দিলেন।

সিদ্দিক সালিক লিখছেন, “আমি দেখছিলাম ২৯ ক্যাভালরির রেঞ্জাররা রংপুর থেকে আনানো পুরনো এম-২৪ ট্যাঙ্কগুলো অয়েলিং করছিল। ক্র্যাকডাউনের সময় ঠিক করা হয়েছিল ২৬ মার্চ রাত একটায়। আশা করা হচ্ছিল যে ততক্ষণে ইয়াহিয়া খান করাচিতে পৌঁছে যাবেন।”

২৫ তারিখ রাত সাড়ে এগারোটায় ঢাকার স্থানীয় কমান্ডার টিক্কা খানের কাছে অনুমোদন চেয়েছিলেন ক্র্যাকডাউনের সময়টা এগিয়ে আনার। এরকম খবর আসছিল যে ওরা (বাঙালিরা) ব্যাপক প্রতিরোধের জন্য তৈরি হচ্ছে।

ওই রাতেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সকল পদক্ষেপ চুড়ান্ত করে গোপনে ঢাকা থেকে করাচির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকার গঠন নিয়ে তার লোক দেখানো আলোচনা শেষ না করেই ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছাড়েন।

সিদ্দিক সালিক লিখছেন, “সকলেই ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাষ্ট্রপতি তখন সম্ভবত কলম্বো আর করাচির মাঝামাঝি। জেনারেল টিক্কা আদেশ দিলেন ববিকে বলো যতটা সম্ভব দেরি করতে। রাত সাড়ে এগারোটায় পুরো শহরের ওপরে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা করেছিল। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হয়েছিল।”

যদিও পাক হানাদারদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্রমণের নির্ধারিত সময় ছিল জিরো আওয়ার অথবা রাত ১টা। কিন্তু রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে জীপ, ট্রাক বোঝাই করে পাকিস্তানি  ট্যাঙ্কসহ আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে গর্জে উঠে তাদের আধুনিক রাইফেল, মেশিনগান ও মর্টার।

ঢাকা শহরের রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে তারা বাঙালি নিধন শুরু করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই অতর্কিত হত্যাযজ্ঞে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় ঢাকা শহর।

হাজার হাজার নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালি পাক হানাদার বাহিনীর বর্বর নিধনযজ্ঞ ও ধ্বংসের উন্মত্ত তাণ্ডবে প্রাণ হারায়। মানুষের কান্না ও আর্তচিৎকারে ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়। মধ্যরাতে ঢাকা শহর লাশের শহরে পরিণত হয়। ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে মাত্র এক রাতেই হানাদাররা নৃশংসভাবে হত্যা করে অর্ধ লক্ষাধিক বাঙালিকে। পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে ধর্মের নামে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী কিভাবে একরাতে অসংখ্য ঘুমন্ত, নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এমন বর্বর হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত হয় বিশ্ববিবেক।

তবে ২৫ মার্চ রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অভিযানে হতাহতের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। কারণ, বিদেশি সাংবাদিকদের ২৫ মার্চ অভিযানের আগেই দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। দেশি সংবাদপত্রের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই হত্যাযজ্ঞে হতাহতের সঠিক সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে থাকা তিন বিদেশি সাংবাদিক আর্নল্ড জেটলিন, মাইকেল লরেন্ট, সাইমন ড্রিং-এর লেখনী থেকে সে রাতের ভয়াবহ নৃশংসতা সম্পর্কে জানা যায়।

অকুতোভয় সাংবাদিক ‘সাইমন ড্রিং’ ২৫ মার্চের নৃশংস ঘটনাকে ‘ওয়াশিংটন পোস্টে’র মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রতিবেদক সাইমন ড্রিং তাঁর প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের এই পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের খবর।

সাইমন ড্রিং ‘ডেটলাইন ঢাকা’ শিরোনামে ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তাতে ইকবাল হলের ২০০ ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় শিক্ষক ও তাদের পরিবারের ১২ জন নিহত হওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হয়। পুরনো ঢাকায় পুড়িয়ে মারা হয় ৭০০ লোককে। দেশি বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে যে বিবরণ পাওয়া যায় তাতে ওই রাতে শুধু ঢাকায় ৭ হাজার বাঙালি নিহত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল এবং অন্যান্য ছাত্রহলগুলোতে পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞের চিত্র ভিডিও টেপে ধারণ করেন তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি (বর্তমান বুয়েট এর) এর প্রফেসর নূরউল্লাহ। সেখানে দেখা যায় হত্যাযঞ্জের সেই ভয়াবহ বর্বরতা ও নৃশংসতার দৃশ্য।

অস্ট্রেলিয়ার “সিডনি মর্নিং হেরাল্ড” পত্রিকার ভাষ্যমতে শুধু ২৫ মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। পরবর্তী নয় মাসে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে ৩০ লাখ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। এই বর্বরতার তুলনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ সর্ম্পকে লিখেছেন, ‘সে রাতে ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হয় আরো ৩০০০ লোক। ঢাকায় এই গণহত্যার শুরু হয়েছিল। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্যরা বাড়িয়ে চললো মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট। লুট আর ধ্বংস যেন তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।’

এই নির্মম গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তনের সঙ্কট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তান সরকার মুক্তিযুদ্ব চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়, “১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশী মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।”

২৫ মার্চ রাতে ঢাকার পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশলাইন, নীলক্ষেত এলাকায় আক্রমণ চালায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। এ সময় ২২তম বেলুচ রেজিমেন্ট ঢাকার ইপিআর সদর দপ্তর পিলখানার বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করে এবং ইপিআর দফতরের ওয়্যারলেস ব্যবস্থা দখল করে নেয়।

অন্যদিকে ১৮ নম্বর পাঞ্জাব, ৩২ নম্বর পাঞ্জাব ও ২২ নম্বর বেলুচ রেজিমেন্ট ট্যাংক ও মর্টার হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। হানাদার বাহিনীর মেশিনগানের গুলি, ট্যাংক-মর্টারের গোলা আর আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে সবচেয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। এই হত্যাযজ্ঞ চলে ২৫ মার্চ রাত থেকে ২৬ মার্চ সকাল পর্যন্ত।

সিদ্দিক সালিক লিখছেন, “এক সিনিয়র স্টাফ অফিসার আমার হাত থেকে ওয়ারলেস সেটটা কেড়ে নিয়ে জানিয়েছিলেন ওদের শেষ করতে তোমার আর কত সময় লাগবে? চার ঘণ্টা! .. যত্তসব.. তোমার কাছে কী অস্ত্র আছে? রকেট লঞ্চার. রিকয়েলস গান. মর্টার.. সব কিছু একসঙ্গে চালাও.. দু’ঘণ্টার মধ্যে পুরো এলাকা দখল করে রিপোর্ট কর।”

ওই রাতের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে পাক হানাদার বাহিনী ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১০ জন শিক্ষককে নৃশংস ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। জহুরুল হক হলের প্রায় ২০০ ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করে। এই জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চলে মেয়েদের রোকেয়া হল সহ প্রতিটি ছাত্রাবাসে।

আর্চার কে ব্লাড ‘The cruel birth of Bangladesh’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় এবং ছাত্রীরা আগুন থেকে বাঁচতে হলের বাইরে আসা শুরু করলে পাকবাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে আর্মি ইউনিট ৮৮ এর কথোপকথন থেকে জানা যায়, আনুমানিক ৩০০ জন ছাত্রীকে সে রাতে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে, রাজারবাগে গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশ সদর দফতর। বাংলার ১১শ’ পুলিশকে হত্যা ও সমগ্র ব্যারাক গুঁড়িয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সবকিছু।

ঢাকা শহরে তৈরি হয় লাশের স্তূপ। মায়ের কোলে ঘুমন্ত শিশু থেকে শুরু করে গৃহবধূ ও নববধূ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার রক্তে রঞ্জিত ও কলঙ্কিত হয়েছে মানব সভ্যতার হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস। এই রাতে রচিত হয়েছে বিশ্বের জঘন্যতম গণহত্যার ইতিহাস। একইসঙ্গে এই রাতে ‘বাংলাদেশ’ নামের স্বাধীন-সার্বভৌম বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় নিশ্চিত হয়েছে।

চারিদিকে লাশের স্তুপ বেয়ে রক্ত বন্যা, আগুনের ধ্বংসাত্মক লেলিহান শিখা, পাশবিক ও লোমহর্ষক ধর্ষণ-গণধর্ষণ এবং দানবীয় লুণ্ঠন আর অবর্ণনীয় নিপীড়ন-নির্যাতনের বিভৎস বর্বরতার মধ্যেই ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর পরিচালিত হয় পাকবাহিনীর স্পর্শকাতর অভিযান ‘অপারেশন বিগবার্ড’। এই অপারেশনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে গ্রেফতার করা হয় বাঙালি অবিসংবাদিত ও প্রাণপ্রিয় নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে।

রাত একটার দিকে কর্নেল জেড এ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা দল ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে পৌঁছে। জেড এ খান ‘দা ওয়ে ইট ওয়াজ’ গ্রন্থে লিখেছেন, “শেখ সাহেবকে গ্রেপ্তার করার পরে ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর ওয়ারলেস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন ‘বিগ বার্ড ইন কেজ, স্মল বার্ডস হ্যাভ ফ্লোন”।

মি. খান লিখেছেন, “আমি জেনারেল টিক্কা খানের কাছে ওয়ারলেসে জানতে চেয়েছিলাম আপনি কি চান শেখ মুজিবকে আপনার সামনে হাজির করাই? উনি উত্তর দিয়েছিলেন, আমি ওঁর মুখ দেখতে চাই না।”

পরে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে। পাকিস্তানে নেওয়ার পর মিয়াওয়ালী জেলের এক সেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। রেডিও তো দূরের কথা, খবরের কাগজও দেওয়া হতো না তাঁকে। প্রায় ৯ মাস তিনি ওখানে ছিলেন। ৬ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে চলা এক সেনা ট্রাইব্যুনাল বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।

তবে গ্রেফতার হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে যে কোনো মূল্যে দেশকে পুরোপুরি শত্রুমুক্ত করার নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণায় জাতিকে জনযুদ্ধের নির্দেশনা দেওয়ার পর, বাঙালি সর্বত্র শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাসের এই সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে বাঙালি ৩০ লাখ শহীদের রক্ত সাগর পেরিয়ে এবং দুই লাখ মা-বোনের অশ্রু বন্যায় ভেসে, বিশ্বমানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’।

১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট (Operation Searchlight) ছিল একটি পূর্ব পরিকল্পিত গণহত্যা। এই গণহত্যার মাধ্যমে তারা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন ও স্বাধীনতার স্বপ্ন নস্যাৎ করতে চেয়েছিল। এটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের ১৯৭০ সালের নভেম্বরে সংঘটিত ‘অপারেশন ব্লিটজ্’ এর পরবর্তী ধাপ।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও, আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করে নি। ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আলোচনার নামে নাটকের মহড়া চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা তাদের প্রভূদের পূর্ব পরিকল্পিত নকশা অনুযায়ী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম গণহত্যা চালায়। নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালি বেসামরিক জনগণের ওপর এই গণহত্যা অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সচেতন নাগরিককে নিশ্চিহ্ন করে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেয়া।

অপারেশন সার্চলাইটের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য ছিল ২৬ মার্চের মধ্যে পূর্ব বাংলার (বাংলাদেশ) সবগুলো বড় শহর দখলে নেয়া এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের এক মাসের ভেতর নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। বাঙালিরা যে পাল্টা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, সেটা পাকিস্তানী হানাদাররা ভাবতে পারেন নি। তারপরও পাক বাহিনী ১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝিতে বাংলার বড় শহরগুলোয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অভিযানের প্রথম ধাপ শেষ করেন।

কিন্তু পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এই ভয়াবহ গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। বাঙালি দখলদার পাক বাহিনীকে বাংলা ছাড়া করতে জীবনপণ জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে ভারত সরকারের সহযোগিতা ও ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে ‘মিত্রবাহিনী’ গড়ে তোলে। তারপর বীরের মতো লড়াই করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। ফলে শত্রুমুক্ত হয় বাঙালির স্বপ্ন সাধনা ও সংগ্রামের বাংলাদেশ।

গত ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। অক্সফোর্ড ডিকশনারী অনুযায়ী গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই দিন জাতীয় সংসদে বলেন, ‘জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ গ্রহণ করে। ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বরকে ‘জেনোসাইড ডে’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। কাজেই আমাদের কাছে সেই সুযোগ রয়েছে, জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী আমরা ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।’

সংসদ কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধিতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) শিরীন আখতারের আনা প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনা শেষে সংসদে তা সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব করলে সংসদ তা পাস করে।  পরে ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা এবং জাতীয় ও আর্ন্তজাতিকভাবে দিবসটি পালনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। দিবসটিকে ‘ক’ শ্রেণীভুক্ত দিবস অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়।

সলিমুল্লাহ খান জানান, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে পাকিস্তান সরকার একটি কমিশন গঠন করেছিল৷ হামিদুর রহমান কমিশনের ওই রিপোর্ট সরকারিভাবে কখনো আলোর মুখ দেখেনি৷ কিন্তু রিপোর্টের অনেক তথ্যই এখন জানা যায়৷ তাতেও ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের গণহত্যার ষড়যন্ত্রের জন্য প্রধানত জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল হামিদ ও টিক্কা খানকে দায়ী করা হয়৷ আর তদন্ত রিপোর্টে ৯ মাসের গণহত্যার কথা উল্লেখ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছিল৷

দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক । প্রকাশের তারিখ: ২৫ মার্চ ২০১৯, সোমবার। ই-মেইল: dyutimoybulbul@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email