দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ, ঢাকা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের খড়গপুর শহরের কাছে হিজলিতে ব্রিটিশদের একটি ডিটেনশন ক্যাম্প ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্বাক্ষী এই হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প।

দখলদার ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য অসহযোগ আন্দোলনে স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকায়, এ পর্যাযে ব্রিটিশ সরকার তাঁদের সাধারণ জেলে বন্দীদের রাখতে পারছিলেন না। তাই ব্রিটিশ ভারত সরকার কয়েকটি নতুন ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে প্রথম ক্যাম্পটি স্থাপিত হয় বক্সার দূর্গে।

১৯৩০ সালে হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প স্থাপিত হয়। এই হিজলি ডিটেনশান ক্যাম্প, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকদের নৃশংসতার ইতিহাসের একটি অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়। জায়গাটা এখন আইআইটি, খড়গপুর নামে পরিচিতি পেয়েছে। তবে আইআইটি ক্যাম্পাসের ভেতরেই সংরক্ষিত রয়েছে কালের স্বাক্ষী সেই ডিটেনশন ক্যাম্প৷ নাম দেওয়া হয়েছে নেহেরু মিউজিয়াম অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনলোজি৷

১৯৩৭ সালে এই ক্যাম্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪০ সালে আবার চালু করা হয় ক্যাম্পটি। ১৯৪২ সালে শেষ বারের মতো ক্যাম্পটি বন্ধ করে বন্দীদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী এই ক্যাম্পটি ব্যবহার করেছিল।

ব্রিটিশের দখল থেকে ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর, ১৯৫১ সালে হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প প্রাঙ্গনেই আইআইটি খড়গপুর স্থাপিত হয়। ১৯৯০ সালে পূর্বতন ডিটেনশন ক্যাম্পের কিছু অংশ নিয়ে চালু হয় নেহেরু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংগ্রহশালা

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই ডিটেনশান ক্যাম্পে বিচারাধীন বন্দীদের আটকে রাখা হতো, ছোট্ট ছোট্ট কুঠুরিতে। সেইসব বন্দী তরুণদের ওপর নির্যাতনের কথা শুনলে আজও চোখ অশ্রুতে ভরে ওঠে। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ত্যাগের কথা আমরা কোনও দিন ভুলতে পারব না।

এই হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্পে ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই মেদিনীপুর কলেজের পাঠরত ছাত্র দীনেশ গুপ্তকে রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান ও সিম্পসন হত্যার দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। তার পরেই হিজলি জেলে ৩ জন বন্দি ত্রিস্তরীয় বেষ্টন পেরিয়ে পালিয়ে যান।

হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্পের প্রশাসনিক ভবন (সেপ্টেম্বর, ১৯৫১)
এর পরেই উন্মত্ত শ-খানেক ব্রিটিশ পুলিশ দিয়ে ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এই হিজলি ক্যাম্পের বন্দিদের উপর বিনা নোটিশে রাতের অন্ধকারে পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে নির্বিচারে গুলি চালান তৎকালীন জেলাশাসক ডগলাস।

গুলিতে নিহত হন বন্দী তারকেশ্বর সেনগুপ্ত ও সন্তোষকুমার মিত্র। আহত হন ২৯ জন। সন্তোষকুমার ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর সহপাঠী। ১৮১৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্নাতক হন তিনি। মাস্টারদা সূর্য সেনের সহকর্মী তারকেশ্বর, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের যোদ্ধা ছিলেন।

এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁদের মৃতদেহ সংগ্রহ করতে হিজলিতে ছুড়ে যান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ভারতের বিশিষ্ট নেতারা এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান।

হিজলি জেলে পুলিশের গুলিতে তাঁদের মৃত্যুর পরের দিন মৃতদেহ নিয়ে নেতাজি মিছিল করেন কলকাতা পর্যন্ত। ক’দিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার শহিদ মিনারের নীচে প্রতিবাদ সভা করেন রবীন্দ্রনাথ।

প্রতিবাদে কলকাতায় লাখো মানুষের সমাবেশ হয়। সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেন, বক্তৃতা দেন। সভায় ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, জহরলাল নেহেরু, বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, দেবেন্দ্রলাল খান প্রমুখ।

“হিজলি গুলি চালনার ঘটনা” নামে পরিচিত এই ঘটনাটিই ভারতের কোনো জেল বা ডিটেনশন ক্যাম্পে গুলি চালনার একমাত্র ঘটনা।

ওই সময় স্টেটসম্যান পত্রিকা কারারক্ষীদের পক্ষে লিখেছিল, কারারক্ষীদের যেন খ্রিষ্টচিত করুণা দেখানো হয়। পত্রিকাটির অজুহাত ছিল এই যে রাজবন্দীদের ব্যবহারে কারারক্ষীদের ওপরে স্নায়বিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে তারা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিল।

জেলাশাসক ডগলাসও বন্দী অত্যাচারের রিপোর্টে বন্দীদের উৎশৃঙ্খল আচরণের কথা উল্লেখ করেন। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তার পুলিশ প্রশাসনকে বেকসুর নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করলেন।

স্টেটসম্যান পত্রিকার বন্দী হত্যার ছাফাইয়ের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ওই পত্রিকায় একটি চিঠি লেখেন। স্টেটসম্যান চিঠিটি ছাপায়নি বরং উদ্ধতভাবে তা কবিগুরুর কাছে ফেরত পাঠায়। এই পটভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতাটি রচনা করেন। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর কামারের এক ঘা বইটিতে এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।

হিজলি কারাগারে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে যারা নিরস্ত্র রাজবন্দীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তাদের উপলক্ষ করে ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন,

“ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে/দয়াহীন সংসারে।/তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালোবাসো/অন্তর হতে বিদ্বেষ দ্বেষ নাশো’।/বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির দ্বারে,/আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।”

‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,/তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ। তুমি কি বেসেছ ভালো?’

ঘাতক কারারক্ষীদের ক্ষমা করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ। ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হৃদয়ে ভগবানকেই তিনি প্রশ্ন করেছেন, তুমি কি ওদের ক্ষমা করতে পেরেছ? উল্লেখ্য, ১৯৩২ সালের ৩০ এপ্রিল বিপ্লবীদের গুলিতে নিহত হন জেলাশাসক ডগলাস। সূত্র: উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ, ইন্টারনেট

দ্যুতিময়বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক
dyutimoybulbul@gmail.com
প্রকাশের তারিখ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, রোববার।

Print Friendly, PDF & Email