বাঙালিনিউজ
ফের ভারতে জাতীয় কংগ্রেস দলের সভাপতি হলেন সোনিয়া গান্ধী।

বাঙালিনিউজ
আন্তর্জাতিকডেস্ক

ফের ভারতে জাতীয় কংগ্রেস দলের সভাপতি হলেন সোনিয়া গান্ধী। ছেলে রাহুল গান্ধীর জায়গায় কংগ্রেসের সভাপতি পদে ফিরলেন তিনি। তবে বলা হচ্ছে, সোনিয়া গান্ধীর এই দায়িত্ব গ্রহণ ‘আপাতত’। গতকাল ১০ আগস্ট ২০১৯ শনিবার, কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির এক বিবৃতি বলা হয়েছে, এআইসিসি নতুন সভাপতি নির্বাচন না-করা পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সভাপতি হিসেবে কাজ চালাবেন সনিয়া।

বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর, ২৫ মে কংগ্রেসের সভাপতির পদ ছেড়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর নাতি তথা রাজীব গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর পুত্র রাহুল গান্ধী। তার পর আড়াই মাস ধরে দলের বড়-মেজ-সেজ-ছোট নেতারা তাঁর মত বদলের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু রাহুল মত পরিবর্তনে রাজি হননি। শুধু তা-ই নয়, জানিয়ে দিয়েছেন সভাপতি হবেন না তাঁর ছোট বোন প্রিয়ঙ্কা গান্ধীও। তখন সোনিয়া গান্ধীকে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। তিনিও সাড়া দেননি।

শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে অচলাবস্থার কারণে বিভ্রান্তিতে পড়েছিল কংগ্রেস। সংসদের সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে কংগ্রেসের সঙ্কট আরও প্রকট হয়। রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-থাকা সত্ত্বেও বিরোধীদের পাত্তা না দিয়ে তিন তালাক বিল এবং ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ ও জম্মু-কাশ্মীর বিভাজন বিল পাশ করিয়ে নেয় নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার। ফলে নতুন সভাপতি বাছাইয়ের জন্য দাবি জোরদার হতে থাকে কংগ্রেসে।

কিন্তু কংগ্রেস সভাপতি পদে গান্ধী পরিবারের বাইরে একক কোনও নামে ঐকমত্য সম্ভব নয়নি। যদিও মুকুল ওয়াসনিক, মল্লিকার্জুন খড়্গে, কুমারী শৈলজা, সুশীল শিন্ডে, পি এল পুনিয়ার মতো প্রবীণ নেতাদের নাম সভাপতি পদের জন্য উঠেছিল। কেউ কেউ আবার নবীন প্রজন্মের জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া ও সচিন পাইলটের পক্ষেও মত দেন।

কংগ্রেস সূত্রের খবর, মুকুল ওয়াসনিককে সভাপতি করার বিষয়টি মোটের উপরে ঠিকই করে ফেলেছিলেন আহমেদ পটেল, এ কে অ্যান্টনিরা। ঠিক করে ফেলেছিলেন, ১০ আগস্ট শনিবার সকালে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে তাঁর নাম চূড়ান্ত করা হবে।

কিন্তু গত ০৯ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যায় খেলা ঘুরিয়ে দেন রাহুল গান্ধী নিজেই। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, মুকুল ওয়াসনিকের হাত ধরে দলের নিয়ন্ত্রণ আহমেদ পটেলদের হাতে যাক, এটা রাহুলের পসন্দ না। তাই দলের অন্য নেতাদের মতামত নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

এই অবস্থায় শনিবার সকালে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সবাই রাহুলকেই সভাপতি থেকে যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাহুল বলেন, ‘‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।’’ তখন ওয়ার্কিং কমিটির বাইরে থাকা নেতাদের মত নিতে পাঁচটি কমিটি গড়া হয়। সেই আলোচনার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই এআইসিসির দফতর থেকে বেরিয়ে যান সোনিয়া ও রাহুল। সোনিয়া বলেন, ‘‘প্রাক্তন সভাপতি হিসেবে আমার ও রাহুলের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা ঠিক হবে না।’’

আলোচনা শুরু হতেই কংগ্রেস নেতাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলতে থাকেন, রাহুলকেই সভাপতি পদে থাকতে হবে। যেমন পুন্ডুচেরির মুখ্যমন্ত্রী ভি নারায়ণস্বামী বলেন, ‘‘রাহুল গান্ধীর বিকল্প নেই। তিনিই দলকে মজবুত করতে পারেন। একমাত্র গান্ধী পরিবারই নেতৃত্ব দিতে পারে।’’

রাহুল যেহেতু শনিবার সকালেও নতুন সভাপতি বাছার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাই অঞ্চলভিত্তিক পাঁচটি কমিটির রিপোর্ট নিয়ে রাতে ফের বৈঠকে বসে ওয়ার্কিং কমিটি। দেখা যায়, রাহুলকে সভাপতি রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন অধিকাংশ নেতা। অনেকে আবার প্রিয়ঙ্কাকে অনুরোধ করেছে‌ন, তিনি যেন দাদাকে বোঝান সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য।

রাহুল কিছুতেই রাজি হননি। সভাপতি বাছাই নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন তিনি বৈঠকে ছিলেনও না। মাঝে এক ঘণ্টার জন্য আসেন কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে। এই অবস্থায় সোনিয়ার দ্বারস্থ হন কংগ্রেস নেতারা। তাঁরা বলেন, গান্ধী পরিবারের বাইরে কেউ সভাপতি হলে দল ভেঙে যাবে। ফলে সোনিয়া ছাড়া গতি নেই। দীর্ঘ অনুরোধ-উপরোধের পরে নরম হন সোনিয়া। তবে জানিয়ে দেন, এই ব্যবস্থা নেহাতই অস্থায়ী। যত শীঘ্র সম্ভব নয়া সভাপতি বাছতে হবে।

যদিও এই ব্যবস্থা কতটা অস্থায়ী হবে, তা নিয়ে দলের অন্দরেই সংশয় রয়েছে। তাঁদের মতে, গান্ধী পরিবারের বাইরে অন্য কোনও নাম নিয়ে যে দলে ঐকমত্য নেই, তা ফের স্পষ্ট হয়েছে। একজন নেতাকে সভাপতি করলে অন্যদের দল ছেড়ে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে ভবিষ্যতেও গান্ধী পরিবারের বাইরে কাউকে সভাপতি করা কঠিন হবে।

তবে রাহুলের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার সুরও শোনা যাচ্ছে কংগ্রেসের অন্দরে। এই নেতাদের বক্তব্য, দলের সর্বস্তরের নেতাদের মতামত নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে রাহুল প্রমাণ করলেন, দলে তাঁর বিকল্প নেই। তা হলে তিনিই সভাপতি থেকে গেলেন না কেন! নতুন সভাপতি নির্বাচনে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না, এ কথা বারবার জোর দিয়ে বলা সত্ত্বেও কেন রাহুল নেপথ্যে সক্রিয় হলেন, সেই প্রশ্নও উঠেছে। ওই নেতাদের মতে, গান্ধী পরিবারের কেউ সভাপতি হবেন না বলার পরে যা হল, তাতে তো বিজেপি আরও জোর গলায় বলার সুযোগ পাবে যে, গান্ধী পরিবারের বাইরে কিছু ভাবার ক্ষমতা কংগ্রেসের নেই।

বিজেপির পক্ষ থেকে গতকাল সরকারি ভাবে কিছু বলা হয়নি ঠিকই, কিন্তু দলের নেতারা একান্তে বলতে শুরু করেছেন, ছেলের রাজনৈতিক কেরিয়ার ডুবে যাচ্ছে দেখে মাকে আসরে নামতে হলো। পরিবারতন্ত্রেই কংগ্রেস আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা।

কংগ্রেসের গান্ধীপন্থী নেতাদের দাবি, এ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। সামনেই তিন রাজ্যের বিধানসভা ভোট। গান্ধী পরিবারের বাইরে কাউকে সামনে রাখলে সেখানে সামান্যতম প্রতিরোধও গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

কিন্তু এর পরে কী হবে? সোনিয়া গান্ধীর বয়স এখন ৭২। তার উপরে তিনি বেশ অসুস্থ বলেই দলীয় সূত্রে খবর। ফলে তাঁর পক্ষে কত দিন হাল ধরে থাকা সম্ভব? কংগ্রেসের একটি সূত্র বলছে, আজ হোক বা কাল, সেই রাহুলকেই নেতৃত্বে ফিরতে হবে। তা না হলে দল থাকবে না। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা।

Print Friendly, PDF & Email