বাঙালিনিউজ

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ, ঢাকা

মারিয়া ইয়ুরেভনা শারাপোভা। সাবেক এক নম্বর রাশিয়ান পেশাদার টেনিস খেলোয়াড় তিনি। সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাঁচটি গ্র্যান্ডস্ল্যাম সিঙ্গেলস চ্যাম্পিয়ন ও তিনবারের রানার আপ তিনি। উইলিয়ামস বোনদের যুগেও নিজের ইমেজ বেশ ভালভাবেই ধরে রেখেছেন এই রুশ কন্যা। বিশ্ব টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানীয় এই তারকা খেলোয়াড়ের জীবন সংগ্রাম ও সাফল্য যে কারো জন্য অনুপ্রেরণা ও চেতনার আলোকবর্তিকা।

অসাধারণ সব অর্জনের পথে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের গল্পও রয়েছে রাশিয়ার এই টেনিস তারকার জীবনে। ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার কারণে যে টেনিস থেকে নিষিদ্ধও হন তিনি। তবে নির্বাসন থেকে কোর্টে ফেরার পর থেকেই সংগ্রাম করছেন মাশা। চোট আর ফর্মহীনতার সঙ্গেও লড়াই চলছে রাশিয়ান টেনিসের এই গ্ল্যামার গার্লের। শারাপোভা সর্বশেষ অফিসিয়াল ম্যাচ খেলতে কোর্টে নেমেছিলেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। তবে ফ্রেঞ্চ ওপেনের আগে আরও তিনটি টুর্নামেন্টে খেলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ শারাপোভা। আশা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠেয় ক্রীড়ার মহাযজ্ঞ অলিম্পিকে খেলবেন শারাপোভা।

প্রথমদিকে ক্রিকেট সেনসেশন, সুন্দরী শারাপোভাকে সবাই তুলনা করতেন আনা কুর্নিকোভার সঙ্গে। কিন্তু ধীরে ধীরে আপন আলোয় উদ্ভাসিত হন শারাপোভা। পরে কুর্নিকোভার চেয়ে সবদিকেই অনেক এগিয়ে যান তিনি। পাঁচবার গ্র্যান্ডস্ল্যাম জিতেছেন। ২০০৪ সালের গ্রীষ্মে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি উইম্বলডন শিরোপা জয় করেন।

শারাপোভা প্রথম রাশিয়ান, যিনি উইম্বলডন শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এ কারণেই শারাপোভা বলেছেন, ‘আমি কারও কাছাকাছি নই। আমিই প্রথম শারাপোভা।’ খেলার মাঠে তার সাফল্য সহজে মুছে ফেলার নয়। আয়েও পিছিয়ে নেই। বিশ্বে তিনি মহিলা খেলোয়াড়দের মধ্যে আয়ে সবার ওপরেও উঠেছেন।

সাবেক এক নম্বর পেশাদার এই সুন্দরী টেনিস তারকা আজ ১৯ এপ্রিল ২০১৯ শুক্রবার ৩২ বছরে পা রাখলেন। মূলত ডানহাতি কিন্তু সব্যসাচী মারিয়া শারাপোভা আনুষ্ঠানিক ক্যারিয়ার শুরু করেন ২০০১ সালে। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ক্রমাগত সাফল্য পান তিনি। পর্যায়ক্রমে জেতেন উইম্বলডন, ইউএস ওপেন, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ফ্রেঞ্চ ওপেন, গ্রান্ডস্লামসহ আরো নানা পুরস্কার ও সম্মান।

৬ ফুট ২ ইঞ্চি দীর্ঘ স্বর্ণকেশী রুশ টেনিস তারকা শারাপোভা ২০০৭ সালে বিশ্বের সবচেয়ে আবেদনময়ী মহিলা খেলোয়াড়ের খেতাবে ভূষিত হন। কোর্ট এবং কোর্টের বাইরে সবচেয়ে ফ্যাশনেবল তারকা খ্যাতি পান। খেলার সময় নাটকীয় অভিব্যক্তির জন্যও তিনি বহুল আলোচিত। ২০০৬ সালে রাশিয়ান ফেডারেশনের বর্ষসেরা মহিলা টেনিস খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী খেলোয়াড়দের মধ্যে শারাপোভা অন্যতম। নামিদামি সব বহুজাতিক কোম্পানির মডেল তিনি। পেশাগত সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক টেনিস সংস্থার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন। সে বছরই শারাপোভা টেনিসের অন্যতম সেরা আসর উইম্বলডনের শিরোপা জেতে বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেন।

তবে শারাপোভা ২০০৯ সালে কাঁধের ইনজুরির কারণে অস্ত্রোপচার করেন। ওই সময় ছন্দ হারিয়ে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েন তিনি। অবশ্য খুব দ্রুতই সব সামলে নেন। ২০১১ সালে পুনরায় শীর্ষ ১০-এ ফিরে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন তিনি।

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই রুশ টেনিস তারকা ২০১৬ সালে ডোপ নেওয়ার অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। পশ্চিমা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয় যে, আন্তর্জাতিক ডোপ বিরোধী প্রতিষ্ঠানের নিষিদ্ধ ঘোষিত কার্ডিয়াক ড্রাগ মেলডোনিয়াম নিয়মিত গ্রহণ করেন মারিয়া শারাপোভা। হার্টের হার্টে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াসহ এই ড্রাগটি নানা রোগের জন্য ব্যবহার হতো। তাছাড়া ড্রাগটি গ্রহণ করলে শারীরিক কসরত প্রদর্শনে অতিরিক্ত উদ্যম আসে।

এ কারণে অ্যাথলেট কিংবা অন্য খেলোয়াড়রা যেন এই ড্রাগের অপব্যবহার করতে না পারে সে জন্য এই ব্যাপারে সতর্ক হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যে কারণে ১ জানুয়ারি ২০১৬ সালে ড্রাগটি আন্তর্জাতিক ডোপ বিরোধী প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ করে। ফলে এই ড্রাগ গ্রহণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শারাপোভাকে নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক তার ক্যারিয়া হুমকির মুখে পড়েন।

বিতর্কের এক পর্যায়ে বিশ্বের জনপ্রিয় টেনিস তারকা ও জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত শারাপোভা চিকিৎসকদের পরামর্শে শরীরের অন্যান্য অসুখের জন্য মেলডোনিয়াম সেবন করতেন বলে স্বীকার করেন। যে কারণে শারাপোভার ওপর টেনিসে নিষেধাজ্ঞাও জারি হয়। তবে তার সেই নিষেধাজ্ঞা কেটে গেছে।

শারাপোভার জন্ম ও খেলোয়াড় জীবনের সংগ্রামের সূচনা

বিশ্বব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধের টানটান উত্তেজনার সময়, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাইবেরিয়ায় নিয়াগান অঞ্চলে ১৯৮৭ সালের ১৯ এপ্রিল টেনিস তারকা মারিয়া ইয়োরেভনা শারাপোভার জন্ম। তার পুরো নাম মারিয়া ইউরিয়েভনা শারাপোভা। তার পরিবারের আদি নিবাস ছিল সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র বেলারুশ।

শারাপোভার বাবার নাম ইউরি এবং মায়ের নাম ইয়েলেনা। ইউক্রেনের শহর গোমেলে তাদের পরিচয়। এরপর তাদের পরিণয়। শারাপোভার বাবা-মা, কেউ বড়মাপের খেলোয়াড় ছিলেন না। তবে দুজনেই খেলার অনুরাগী ছিলেন। ইউরি কাজ করতেন একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে। তাই শারাপোভার শৈশব খুব একটা সুখের ছিল না।

১৯৮৬ সালের এপ্রিলে চেরনোবিলে ভয়াবহ পরমাণু বিস্ফোরণে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ায় চার মাসের গর্ভবতী ইয়েলেনাকে নিয়ে সাইবেরিয়ার নিয়াগানে পাড়ি জমান ইউরি। যাতে অনাগত শিশু তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা পায়। ফলে সাইবেরিয়ার নিয়াগানেই শারাপোভার জন্ম হয়।

এরপর কয়েক বছর সাইবেরিয়ার নানা এলাকায় ঘুরে ফিরে কাজ করেন শিশু শারাপোভার বাবা ইউরি। তেলের খনিতে কাজ করতেন ইউরি। কিন্তু অধিক ঠাণ্ডায় কারণে চার বছর পর, হাতের কিছু সঞ্চয় নিয়ে ইউরি স্ত্রী-সন্তানসহ রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে কৃষ্ণসাগরের পাড়ে অন্যতম অবকাশ নগরী সোচিতে পাড়ি জমান।

শারাপোভার বাবা-মা টেনিস খেলা পছন্দ করতেন। তাই তারা টেনিস র‌্যাকেট কিনে দেন শিশু কন্যা শারাপোভাকে। তারা মেয়েকে টেনিস খেলা শেখাতে লাগলেন। টেনিস খুব দ্রুত শিখছে মেয়ে। এতে বাবা-মার আগ্রহ বেড়ে যায়। শারাপোভা ছয় বছর বয়সে মস্কোতে এক টেনিস ক্লিনিকে সুযোগ পান। সেখানেই তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা মার্টিনা নাভ্রাতিলোভার নজরে পড়েন।

৯ বারের উইম্বলডন জয়ী নাভ্রাতিলোভা শারাপোভার খেলা দেখে মুগ্ধ হন। তিনি শারাপোভার বাবাকে পরামর্শ দেন মেয়েকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিক বলটিয়েরির টেনিস একাডেমিতে পাঠানোর জন্য। এই একাডেমিতে বিশেষভাবে টেনিসের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অনেক বিখ্যাত টেনিস তারকা এই একাডেমি থেকে শিক্ষা নিয়ে টেনিসে নাম-যশ কুড়িয়েছেন। এদের মধ্যে পিট সাম্প্রাস, আন্দ্রে আগাসি, মনিকা সেলেস অন্যতম।

ইউরি সিদ্ধান্ত নিলেন সপরিবারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবেন। রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা তখন ভালো না। কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় দেশটিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। ডলারের তুলনায় রুবলের দাম অনেক পড়ে যায়।

তারপরও অনেক চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জোগাড় করেন ইউরি। কিন্তু সমস্যা হলো, শুধু বাবা আর মেয়ের ভিসা মেলে। শারাপোভার মা ইয়েলেনার ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তিনি দেশেই থেকে যান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এবং একাডেমিতে ভর্তির জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন ছিল, যা জোগাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন ইউরি। পরে ইউরি ও ইয়েলেনা তাদের বাবা-মা’র কাছ থেকেও অর্থ ধার করেন, শুধু মেয়েকে টেনিস শেখানোর স্বপ্ন পূরণের জন্য তাদের এই কঠিন ত্যাগ ও সংগ্রাম করতে হয়।

এত অল্প বয়সে মায়ের কোল ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো ছিল একটি শিশু কন্যার জন্য বড় কঠিন। তবুও শারাপোভা লক্ষ্যে অবিচল। এ ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারে শারাপোভা বলেন, ‘মনে আছে ব্যাগ গোছানোর সময় আমি কেবল আমার কিছু বই সঙ্গে নিয়েছিলাম। মাকে বলেছিলাম, আমি নিশ্চিত করতে চাই আমার সঙ্গে দেশের কিছু জিনিস আছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবনের খোঁজে শারাপোভা ও তার বাবা

১৯৯৪ সালে শারাপোভা ও তার বাবা নতুন জীবনের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। শারাপোভার বয়স তখন ৭ বছর। নতুন ও অপরিচিত পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলার পাশাপাশি অর্থ জোগানোও কঠিন। মেয়ে শারাপোভাকে টেনিস একাডেমিতে ভর্তি করাতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয় ইউরিকে। কারণ, ওই একাডেমিতে শুধু তাদের আমন্ত্রণ জানানো শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। তাছাড়া শারাপোভার বয়সও ছিল খুব কম।

ফলে মহাচিন্তায় পড়েন ইউরি। কিন্তু দমবার পাত্র নন তিনি। যেভাবেই হোক মেয়েকে তার ভর্তি করতেই হবে। তাই ফ্লোরিডাতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। মেয়ের জন্য একজন কোচও নিয়োগ করলেন। অর্থের জোগাড়ের জন্য দিনরাত নানা কাজ করতে হতো শারাপোভার বাবাকে। তিনি কখনও দোকানের বিক্রয়কর্মী, কখনও হোটেলের ওয়েটার, আবার কখনও পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজও করেছেন।

ইউরি ব্যস্ত থাকতেন যে, শারাপোভা সেই দিনগুলোতে তার একাকিত্বের কথা এখনও স্মরণ করেন। শারাপোভা বলেন, ‘দিনের বেলায় আমাদের খুব কমই দেখা হতো। আমাকে অনেকটা সময় একাই কাটাতে হতো। জানতাম আমি আর সুযোগ পাবো না। যা করার এভাবেই করতে হবে।’

তবে সে সময় সবাই তাকে সুন্দরী টেনিস তারকা আনা কুর্নিকোভার সঙ্গে তুলনা করায় শারাপোভা আরো জেদি হয়ে পড়েন। ভাবেন আনার চেয়েও ভাল কিছু করতে হবে। অবিচল লক্ষ্যে নিষ্ঠা আর একাগ্রতা থাকলে তা অর্জন হবেই-এ বিশ্বাস ছিল বাবা ও মেয়ে দুজনেরই।

মাত্র চার মাসে ইংরেজি শিখেন শারাপোভা। ততদিনে টেনিসে তার দক্ষতা বেড়েছে অনেক। যেমন সার্ভের কৌশল তেমন লাইন থেকে বল ফেরানো। সবই দুর্দান্ত। দুই বছর প্রচেষ্টা ও অপেক্ষার পর, ৯ বছর বয়সে শারাপোভাকে নিয়ে তার বাবা ইউরি ফের বলেটিয়েরি একাডেমিতে যান। একাডেমি কর্তৃপক্ষ আর তাদের ফেরাতে পারেনি।

বরং বলেটিয়েরি একাডেমি শিশু শারাপোভার টেনিস নৈপুণ্যে অবাক। তারা এতটাই মুগ্ধ হয় যে, বছরের ট্রেনিং, টিউশন ও অ্যাকমোডেশন ফি বাবদ শারাপোভার ৪৬,০০০ ডলারের পুরোটাই মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই একাডেমি ছিল ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের (আইএমজি) অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তারা বিনোদন ও ক্রীড়াজগতের মেধাবীদের নিয়ে কাজ করে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিভা বাছাই করে নিয়ে আসে একাডেমিতে।

ওই টেনিস একাডেমি শারাপোভার মধ্যে ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল তারকাকে খুঁজে পেল। তাই শারাপোভার বৃত্তিরও ব্যবস্থা করলো। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র শারাপোভার মায়েরও ভিসার অনুমোদন করলো। দুই বছরের বিচ্ছেদ শেষে ফের একসঙ্গে জীবন শুরু করেন ইউরি-ইয়েলেনা ও শারাপোভা। তবে অল্প দিনের মধ্যে শারাপোভাকে একাডেমির হোস্টেলে উঠতে হয়।

পরে শারাপোভার অনেক সাক্ষাৎকারে জানা যায়, তার একাডেমির জীবন কতটা কঠোর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। অনেক সময় তিনি জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী মেয়েদের নিপীড়নেরও শিকার হতেন। তারা হিংসা করতেন শারাপোভাকে। সেখানে নিয়মিত শ্রেণীতে পাঠ নেয়ার পাশাপাশি ছিল টেনিস কোর্টে ছয় ঘণ্টার অনুশীলন। কিশোরী শারাপোভা মাঝে মধ্যেই ভেঙে পড়তেন।

সাফল্যের পদসোপানে মারিয়া শারাপোভা

শারাপোভার ১১ বছর বয়সে নতুন কোচ এলেন রবার্ট ল্যান্সড্রপ। এই কোচের শিষ্য ছিলেন পিট সাম্প্রাস, ট্রেসি অস্টিন (দুবার ইউএস ওপেন জয়ী) ও লিন্ডসে ডেভেনপোর্টের (তিনটি গ্র্যান্ডস্লাম জয়ী) মতো বিখ্যাত তারকা। অল্প সময়ের মধ্যে শারাপোভা আইএমজির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। ফলে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী এবং জুতা ও কাপড় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নাইকির সঙ্গে প্রথম চুক্তি হয় তার।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন শারাপোভা। ১৪ বছর বয়সেই পেশাদার জগতে পা রাখেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে জুনিয়র বিভাগের ফাইনালে ওঠেন। ২০০৩ সালে শারাপোভা মহিলা টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউটিএ) প্রথম শিরোপা জেতেন এআইজি জাপান ওপেনে। একই বছর উইম্বলডন ওপেনে প্রথমবারের অংশ নেন এবং চতুর্থ রাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছান শারাপোভা। পরের বছরই তিনি এই অভিজাত শিরোপা জয় করেন। তিনি হলেন উইম্বলডনে তৃতীয় কমবয়সী মহিলা চ্যাম্পিয়ন।

দুর্দান্ত প্রতাপশালী সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। বিস্ময়ভরা চোখে তার খেলা দেখেন বিশ্বের কোটি কোটি টেনিসপ্রেমী। ১৯৭৪ সালের পর কোনো রাশিয়ান এই প্রথম ফাইনালে খেলেন, আর প্রথম রাশিয়ান হিসেবে শারাপোভাই এখন পর্যন্ত একমাত্র উইম্বলডন জয়ী।

উইম্বলডন হলো বিশ্বের অন্যতম সেরা অভিজাত আসর। লন্ডনের এক প্রান্তে উইম্বলডন এলাকায় অবস্থিত অল ইংল্যান্ড লন টেনিস এবং ক্রোকেট ক্লাবের এই প্রতিযোগিতার শুরু সেই ১৮৭৭ সালে। এক সময় এ আসরে মেন’স সিঙ্গেলসকে বলা হতো জেন্টেলমেন’স সিঙ্গেলস। ১৮৮৪ সালে প্রথম লেডি’স সিঙ্গেলস শুরু হয়, যা পরে ওমেন’স সিঙ্গেলস নামকরণ হয়। ২০০৫ সালের শেষে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে শারাপোভা চলে আসেন ৪ নম্বরে এবং ২০০৬ সালে জেতেন ইউএস ওপেন শিরোপা।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় শারাপোভার নতুন আবাস

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা শারাপোভাকে নতুন জীবন দিয়েছে। দিয়েছে খ্যাতি ও অর্থবিত্ত। তাই সেখানে স্থায়ী আবাস গাড়েন রুশ সুন্দরী টেনিস কন্যা মারিয়া শারাপোভা। ২০০৫ সালে তার ১৮তম জন্মদিনে নিউইয়র্ক শহরের হিরো নামের এক নাইটক্লাবে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আযোজক ছিল মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মোটরোলা। আগের বছরের উইম্বলডন জয়ের পর মোটরোলা তাকে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করে। এরপর নাইকি ছাড়াও ক্যামেরা প্রস্তুতকারক ক্যানন ও ঘড়ি প্রস্তুতকারী ট্যাগ হিউয়ার, কোলগেট-পালমোলিব ইতাদি প্রতিষ্ঠানের চুক্তিবদ্ধ হন শারাপোভা।

ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাব মতে, ২০০৫ সালে সব মিলিয়ে শারাপোভার আয় দাঁড়ায় ১৮.২ মিলিয়ন ইউএস ডলার। এ থেকে শারাপোভা বলেটিয়েরি একাডেমির কাছাকাছি ফ্লোরিডার ব্রাডেন্টনে ৪৭০০ বর্গফুটের একটি বাড়ি কিনেন, যার দাম ছিল ২.৭ মিলিয়ন ডলার। বাবা-মাকে নিয়ে তিনি ওঠেন তার সেই বাড়িতে। কষ্ট সার্থক হয় শারাপোভার বাবা ইউরি ও মা ইয়েলেনার।

আনা কুর্নিকোভা নয়, নতুন শারাপোভা

সোনালি চুল আর একহারা দীর্ঘাঙ্গী মারিয়া শারাপোভা। রুশ পূর্বসূরি আনা কুর্নিকোভার সঙ্গে তার অনেক মিল। কুর্নিকোভা মাত্র ১৬ বছর বয়সে টেনিস বিশ্বের নজর কাড়েন। অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মডেলও হন তিনি। তবে টেনিস জগতের বড় কোনো প্রতিযোগিতায় শিরোপা জিততে পারেননি তিনি। কুর্নিকোভা সর্বশেষ টেনিস টুর্নামেন্ট খেলেন ২০০৩ সালে। হকি খেলোয়াড় সার্গেই ফেদেরভ আর পপ গায়ক এনরিক ইগলেসিয়াসের সঙ্গে প্রেমের খবরও বেশ আলোচিত হয় সে সময়। মডেলের মতো দেখতে হওয়া ছাড়াও দুই রুশ সুন্দরীর মধ্যে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা অনেক মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন। আর এজন্য অনেকেই শারাপোভাকে নতুন কুর্নিকোভা হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

তবে এসব তুলনায় বিব্রত হন শারাপোভা। তাই ২০০৪ সালে উইম্বলডন শিরোপা জেতার পর এসব তুলনার কড়া জবাব দেন তিনি। শারাপোভা বলেন, আমি কোনো নতুন একজন নই এবং নিশ্চিতভাবেই আমি নতুন কুর্নিকোভা নই। এরপর তিনি বলেন, আমি নতুন শারাপোভা। মানুষ হয়তো ভুলে গেছেন, কুর্নিকোভা এখন আর দৃশ্যপটে নেই। এখন সময় কেবল মারিয়ার, আপনি আমাদের মধ্যে কোনভাবেই তুলনা করতে পারেন না। আর আসলে আনা একটি টুর্নামেন্টও জিততে পারেননি কখনও।’

ধনী মহিলা অ্যাথলেট শারাপোভা

২০১৪ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাবে মারিয়া শারাপোভা ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মহিলা খেলোয়াড়। ফোর্বসের হিসাবে, শারাপোভা ২০১৪ সালে ২২ মিলিয়ন ডলার আয় করেন। সে সময় নাইকির সঙ্গে তার ৮ বছরে ৭০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়। ৫ বছর করে চুক্তি ছিল এইভান, কোল হান, ট্যাগ হিউয়ার সঙ্গে। ছোটখাটো আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সে সময় তার চুক্তি হয়।

সেরেনার সঙ্গেও নাইকিসহ খ্যাতনামা অনেক প্রতিষ্ঠানের চুক্তি থাকলেও, সেরেনার চেয়ে শারাপোভা প্রতি বছর আয়ে অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলার এগিয়ে ছিলেন। টেনিসের দর্শকরা সাধারণত ফুটবল-হকি-বাস্কেটবল বা ক্রিকেটের দর্শকদের চেয়ে বেশি অভিজাত ও ধনী। গলফ, ঘোড়দৌড়, সেইলিংয়ের ক্ষেত্রেও তাই। এজন্য এসব খেলায় পৃষ্ঠপোষকতায় ও বিজ্ঞাপনে আসে সব অভিজাত প্রতিষ্ঠান।

যেমন ভক্সওয়াগন কোম্পানির পোরশে গাড়িরও বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন শারাপোভা। এ গাড়ির ৮৫ ভাগ ক্রেতাই ছিলেন পুরুষ। তাই তারা মেয়েদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে শারাপোভাকে পছন্দ করেন। ২০১০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আনিতা এলবার্সে এক গবেষণায় দেখান যে, শারাপোভা কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হলে তাদের বিক্রি অন্তত চার শতাংশ বেড়ে যায়।

শারাপোভা ২০১২ সালে সুগারপোভা নামে এক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এরা ক্যান্ডি গামি লিপস ও টেনিস বল চিউইং গাম উৎপাদন করে। পরে তারা পোশাক ও ফ্যাশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্যও উৎপাদন করতে থাকে। নিজেই অনেক পোশাকের নকশা করে থাকেন শারাপোভা। নিজের আয় থেকে ৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন তিনি এই ব্যবসায়। উৎপাদনে যাওয়ার প্রথম ছয় মাসেই সুগারপোভা ৩০,০০০ ব্যাগ ক্যান্ডি বিক্রি করে।

মারিয়া শারাপোভার জীবন দর্শন

‘কোনো কিছুই আমাকে ভীত করে না। কারণ, আমি ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। চেষ্টা না করা পর্যন্ত আপিন কখনও জানেন না কি হবে। সুতরাং, যদি চেষ্টা না করেন আপনি তো ব্যর্থ হবেনই। আমি কেবল সেরা হওয়ার জন্য সবসময় চেষ্টা করি।’ শারাপোভা বলেন, ‘টেনিস অবশ্য আমাকে অনেক অর্থ, যশ ও খ্যাতি দিযেছে। আর এজন্য আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করছি, অনুশীলন করছি। তবে কেবল এটাই আমার জীবন নয়।’

শারাপোভা কারো প্রতি বিদ্বেষ বা হিংসা করেন না। বরং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ব্যাপারে তিনি উদার। তাদের প্রশংসা করতেও দ্বিধা করেন না। যেমন সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে উইম্বলডন জেতার পরও শারাপোভা বলেছিলেন, সেরেনার কাছে অনেক খেলায় হেরে গেছেন তিনি। ১৭ বার তার সঙ্গে লড়ে জিতেছি মাত্র একবার।’

সেরেনার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে শারাপোভা বলেন, ‘আপনি নিশ্চয় ভালো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধেই খেলতে চান, আর সে তো সবার সেরা। হ্যাঁ, আপনি তার বিরুদ্ধে অনেকবার জিততে পারবেন না। তবে আমি যদি সেরেনার মতো কারও সঙ্গে খেলার সুযোগ পাই, তবে আমিও ভালো করবো। আমি তাকে হারানোর চেষ্টা তো করতে পারবো। আমি তাকে সহজে ছাড় দেবো না। আমি একজন লড়াকু প্রতিদ্বন্দ্বী।’

শারাপোভা টেনিস খেললেও দেখেন খুব কম। তিনি বলেন, ‘আমি টেনিস ভালোবাসি। তবে দেখার সুযোগ হয় কম। তবে বুলগেরিয়ান খেলোয়াড় গ্রিগর দিমিত্রভ যখন খেলেন, তখন টেলিভিশনের সামনে বসে পুরো খেলা দেখি।’

শারপোভা ম্যাচের প্রতিটি পয়েন্টে, সেটা তিনি হারেন কিংবা জিতেন, শেষটায় একই রকম করেন। তিনি বেস লাইনের পেছনে আসেন এবং দর্শকদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তার র‌্যাকেটের তারগুলো পরখ করেন। মুখে একরকম আভা ছড়িয়ে বলটাকে কয়েকবার মাটিতে ড্রপ খাওয়ান। এরপর বল ঘুরিয়ে সার্ভ করেন তীব্রগতিতে।

মারিয়া শারাপোভার প্রেম ও বিয়ে

মারিয়া শারাপোভার চেহারার সৌন্দর্য, তাকে কোর্টের বাইরে আরো জনপ্রিয় করেছে। ২০০৯ সালে স্লোভেনিয়ান এক পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় শারাপোভার। সাশা ভুয়াসিচ নামের ওই খেলোয়াড়ের সঙ্গে এক বছর প্রেম করার পর তারা ঘোষণা দেন ২০১০ সালের অক্টোবরে বাগদানও করেছেন। কিন্তু ২০১২ সালের ইউএস ওপেন চলাকালে এক সংবাদ সম্মেলনে শারাপোভা জানান, তাদের মধ্যকার বাগদান আর নেই, ভুয়াসিচের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ।

এরপর বুলগেরিয়ান টেনিস খেলোয়াড় গ্রিগর দিমিত্রভের সঙ্গে ২০১৩ সাল থেকে প্রেম করে আসছেন শারাপোভা। ওই বছরের ১৩ মে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের রাস্তায় প্রকাশ্যে তারা পরস্পরকে চুম্বন করেন। সেই দৃশ্য প্রচারিত হয় সর্বত্রই। তখন থেকেই কার্যত স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করছেন মারিয়া শারাপোভা ও গ্রিগর দিমিত্রভ।

জীবনে মায়ের ভূমিকা সম্পর্কে শারাপোভা

জীবনের স্বর্ণ শিখরে উঠলেও, অতীত ভুলে যাননি টেনিস সুপারস্টার মারিয়া শারাপোভা। রাশিয়ায় তার খুব বেশি স্মৃতি না থাকলেও তিনি বলেন, আমি যেখান থেকে এসেছি তার জন্য আমি গর্বিত।

শারাপোভার মাকে খুব একটা দেখা না যাওয়ায় তিনি অনেকটা রহস্যাবৃতই রয়ে গেছেন। ইয়েলেনাকে মেয়ের খেলার সময়ও দেখা যায় না। কেউ কেউ আবার তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও নানা মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনেও অনেক সময় মাকে নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন শারাপোভা।

একবার এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনার পিতাকে তো সব সময় দেখা যায়। তো আপনার ক্যারিয়ারে মায়ের কোনো ইতিবাচক ভূমিকা আছে কিনা। জবাবে শারাপোভা বলেন, মা আমার মধ্যে সব ইতিবাচক জিনিসেরই জন্মদাত্রী। তিনি খুবই শান্ত ও বুদ্ধিমান মহিলা। তিনি জীবন নিয়ে অনেক সুখি। নিজের জীবন নিয়ে এবং আমাকে নিয়েও সুখি। মা-বাবা দুজনই আমার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যে জন্য আমি আজ এ জায়গায় আসতে পেরেছি। আমার মা আমাকে সব সময় শিক্ষিত করে তুলতে চাইতেন। তিনি আমার পড়া তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন সব সময়। এখন বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব তারই। তিনি আমার ভক্তদের মেইলের জবাবও দিয়ে থাকেন। তিনি খুব চমৎকার একজন মহিলা।

Print Friendly, PDF & Email