বাঙালিনিউজ
জাতিসংঘের বিশেষ দূত ও জনপ্রিয় হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ছবি: সংগৃহীত

বাঙালিনিউজ
জাতীয় ডেস্ক

বাংলাদেশ সফররত হলিউড সুপারস্টার ও জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর-এর বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলি মিয়ানমার থেকে ১০ লাখেরও বেশি প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় ‘মাদার অব হিউম্যানেটি’ খ্যাত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নেতা।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত ও জনপ্রিয় হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় এই মন্তব্য করেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

সাক্ষাতের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় খুবই প্রশংসা করেছেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি এবং প্রধানমন্ত্রীকে উদাহরণ সৃষ্টিকারী নেতা বলেছেন তিনি।

এই মুহূর্তে বিশ্বে শেখ হাসিনার মতো নেতা খুব কমই রয়েছেন উল্লেখ করে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বলেছেন, “ এই মূহুর্তে বিশ্বে আপনার মতো লিডার কম আছে। বিশ্বে এরকম নেতার দরকার আছে।”

নিপীড়নের মুখে ২০১৭ সালের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তার আগে থেকে এখানে আছে আরও ৪ লাখ রোহিঙ্গা।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে মিয়ানমার এই শরণার্থীদের নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেও আতঙ্কিত রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে ভয় পাচ্ছে।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে, রোহিঙ্গাদের তাদের আবাসস্থল রাখাইন প্রদেশে নিরাপদে থাকার মতো পরিবেশ এখনও তৈরি করতে পারেনি মিয়ানমার সরকার।

বাঙালিনিউজ

জোলি আগের দিন মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রোহিঙ্গাদের রাখাইনে নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের ক্ষেত্র তৈরির দায়িত্ব মিয়ানমারকে নিতে হবে। “ (সেখানে) অনুকুল পরিবেশ তৈরি করে তাদের ফেরৎ নিতে হবে,” শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকেও বলেন এই হলিউড অভিনেত্রী।

আশ্রয় নেওয়া ‘এত’ মানুষের খাওয়ানো-পরানোকে কঠিন কাজ উল্লেখ করে জোলি বলেন, জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর, বিশ্ব ব্যাংক তারা একসঙ্গে কাজ করবে, যাতে বাংলাদেশের বোঝাটা একটু কমে।

জাতিসংঘ দূত বলেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের ওপর বিশাল বোঝা সৃষ্টি করেছে। আশ্রয় শিবিরগুলোতে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের দেখভাল করা খুবই কঠিন কাজ।

এ প্রসঙ্গে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি আশ্বাস দেন যে, জাতিসংঘ, ইউএনসিএইচআর ও বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের বোঝা লাঘবে একযোগ কাজ করবে। তিনি বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থানরত মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ওপরও জোর দেন।

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ইস্যুতে সহযোগিতার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জোলি উল্লেখ করেন যে, তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নারীদের ওপর নির্যাতন ও তাদের হত্যার সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে শুনেছেন।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট অবশ্যই সমাধান করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী এবং তাদের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনে দেশটির সঙ্গে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সেই চুক্তি বাস্তবায়নে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দেরি করায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হতাশার কথাও তুলে ধরেন বলে প্রেস সচিব জানান।

বাঙালিনিউজ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে আশ্রয় শিবিরগুলোতে এ পর্যন্ত ৪০ হাজারের মতো নতুন শিশুর জন্ম হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে তাঁর সরকারের গৃহীত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এক লাখের বেশি শরণার্থী সেখানে অপেক্ষাকৃত উন্নত পরিবেশে সাময়িক আশ্রয় পাবে।

আড়াই বছর আগে পালিয়ে এসে যে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের ঘরে প্রায় ৪০ হাজার শিশু জন্ম নিয়েছে। এই শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন জোলি তাদের ‘যথাযথ’ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার পরিদর্শনের সময় তিনি শুনেছেন কিভাবে হত্যা, ধর্ষণ ও নিযাতন করা হয়েছে। জোলি বলেন, নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার কথা তিনিও শুনেছেন।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জুলিকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি লোক পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন।

শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালে তাঁর মাসহ তিনি ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের গৃহবন্দী থাকার এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ৬ বছর ধরে তাঁর নির্বাসনে থাকার মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দেন।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সেই বেদনার কাহিনী শুনে খুবই দুঃখ প্রকাশ করেন, জানান প্রেস সচিব।

প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানার পুত্র রেদোয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব নজিবুর রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: বাসস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

Print Friendly, PDF & Email