বাঙালিনিউজ
নৃত্য-গীতে মুখরিত শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা উৎসব। ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে!

বাঙালিনিউজ
আন্তর্জাতিকডেস্ক

গত ০৪ জুন ২০১৯ মঙ্গলবার, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যবাহী বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। আর সেই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কারণ, ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, মেলা নিয়ে বারবার পরিবেশ আদালতে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ মেলা পরিচালনা করতে আগ্রহী নয়। তাদের এখন এ ধরনের পরিকাঠামো নেই।

ফলে, পৌষমেলা করতে গিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বিশ্বভারতীকে। অথচ পৌষমেলা এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মহামিলনমেলা হিসেবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মেলা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা পেয়ে বসেছে বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সেখানকার মানুষের মনে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন।

জানা গেছে, মেলা নিয়ে গত ০৪ জুন মঙ্গলবার বিশ্বভারতীর লিপিকা প্রেক্ষাগৃহে এক বৈঠক বসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য অধ্যাপক বিদ্যুৎ চক্রবর্তীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কর্মকর্তা এবং ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্যরা। ওই বৈঠকে ঠিক করা হয়েছে, ৭ থেকে ৯ পৌষ পর্যন্ত নানা কর্মসূচি পালন করবে বিশ্বভারতী।

বিশ্বভারতী ভবন। ছবি: সংগৃহীত

তবে সেখানেই পৌষমেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় উঠে আসে মেলা নিয়ে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সুভাষ দত্তের বারবার মামলার বিষয়টি। পরিবেশ আদালতে করা ওই মামলায় পক্ষ করা হয়েছে বিশ্বভারতীকে।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দীক্ষা দিবসকে স্মরণ করে প্রতিবছর বসে এই পৌষমেলা। ১৩০১ বঙ্গাব্দের ১ পৌষ সূচনা হয়েছিল এই মেলার। প্রথমে কাচ মন্দিরের সামনে এক দিনের জন্য বসত এই মেলা। এখন বসছে পূর্বপল্লির মাঠে। এই মেলায় লোকগীতি, পল্লিগীতি, বাউল, লোকনৃত্যর মতো নানা আয়োজন হয়।

শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। বীরভূমের বোলপুর মহকুমায় অবস্থিত কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্র আবহেই এই মেলা বসে।

জানা গেছে, ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর (১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ) কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ২০ জন অনুগামীকে নিয়ে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছ থেকে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। এটিই শান্তিনিকেতনের পৌষ উৎসবের মূল ভিত্তি।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজ হাতে গড়া বিশ্বভারতীতে পৌষ উৎসব।

১৮৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর (১২৯৮ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ) শান্তিনিকেতনে একটি ব্রাহ্মমন্দির স্থাপিত হয়। ১৮৯৪ সালে ব্রাহ্মমন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী স্মরণে মন্দিরের উল্টোদিকের মাঠে একটি ছোটো মেলা আয়োজন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনের সেই পৌষমেলা শুধু বীরভূম জেলার নয়, অন্যান্য অঞ্চলের পর্যটকদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের বহু ছাত্রছাত্রী-গবেষক পৌষমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মেলার দিন সকালে বৈতালিকের মধ্যদিয়ে মেলার প্রধান আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ছাতিমতলায় বিশেষ উপাসনাও অনুষ্ঠানের অন্যতম অংশ।

ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলায় বাংলা লোকসংগীত বিশেষ করে বাউল গানের আয়োজন থাকে। এছাড়া লোকসংগীতের সঙ্গে লোকনৃত্য ও লোকক্রীড়া অনুষ্ঠিত হয়। শুধু তাই নয়, শান্তিনিকেতনের এই মেলা হলেও পশ্চিমবঙ্গের সব অঞ্চলের সাংস্কৃতিক নিদর্শনের একটি প্রদর্শনীও চলে এই পৌষ মেলায়। শান্তিনিকেতনের অর্থাৎ বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীরা নাচ, গান ও নাটকের আয়োজন করেন। মেলার ক’দিন জুড়েই হরেক রকম অনুষ্ঠান আয়োজন করেন আয়োজকরা।

বছরের অন্য সময়ে শান্তিনিকেতনে গড়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার পর্যটক আসেন। কিন্তু শুধু পৌষ মেলার সময় এই সংখ্যা বেড়ে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজারে পর্যন্ত উন্নীত হয়। সরকারিভাবে এখানে ৭৫টি আবাসিক হোটেলে পর্যটকরা থাকতে পারেন। কিন্তু এছাড়াও শহরের প্রচুর বেসরকারি আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থা থাকায় পর্যটকরা এই আয়োজনে অংশ নিতে ভিড় জমান।

Print Friendly, PDF & Email