তাফসীর বাবু
বিবিসি বাংলা, ঢাকা
২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে ‘দিনবদল’র নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিলো, মনে করা হয় সে সময় ভোটার টানতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলো সেই ইশতেহার। দলটি বলছে, এবারও মহাজোটকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন ধরে রাখার বিশদ পরিকল্পনাসহ একটি ইশতেহার তৈরির কাজ শেষ করে আনছেন তারা।
তবে ইশতেহারের কাজ এগিয়ে গেলেও, নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনও আলোচনাই শুরু হয়নি শরীক দলগুলোর মধ্যে।

আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের শরীক দুটি দলের নেতা জানিয়েছেন, সিট বণ্টনসহ মহাজোটের বেশ কিছু নির্বাচনী পরিকল্পনা আটকে আছে, বিএনপি নির্বাচনে আসবে নাকি আসবে না তার উপর।

কিন্তু নির্বাচন নিয়ে এখন ঠিক কী পরিকল্পনায় এগুচ্ছে মহাজোট? ইশতেহারেই বা ভোটার টানার মতো নতুন কী প্রতিশ্রুতি থাকবে?

২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে, একটানা দুই মেয়াদে প্রায় ১০ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। প্রথম মেয়াদে মহাজোট ক্ষমতায় আসার আগে, দিনবদলের একগাদা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। দশ বছরে সেসব প্রতিশ্রুতির কতটা পূরণ হয়েছে?

ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া এভিনিউতে কথা হয় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাথী জিন্নাতের সঙ্গে।

গত ১০ বছরে মহাজোটের শাসন নিয়ে একরকম সন্তুষ্টিই প্রকাশ পেলো তার বক্তব্যে।

“সরকার তো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের বিচার করেছে এবং করছে। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুসহ রাস্তা-ঘাটের উন্নয়নেও কাজ হচ্ছে। তবে কর্মসংস্থান এবং শিক্ষার মান বাড়ানোর দিকে আরো নজর দেয়ার দরকার ছিলো,” বলছিলেন খাদিজা আক্তার।

তবে লামিয়া হাসান নামে আরেক জন একেবারেই সন্তুষ্ট নন।

তিনি বলছিলেন, “সরকার আসলে উন্নয়নের একটা মিথের মধ্যে আছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলেন আর অবকাঠামো উন্নয়ন বলেন, এগুলো তো যুগের চাহিদা। যে সরকারই আসুক এগুলো করতেই হতো। কিন্তু আসল জায়গায় কী হচ্ছে? দেশে কি আইনের শাসন আছে? মানুষ তো এখনো পুলিশের কাছে যেতে ভয় পায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেভাবে দমন করা হলো, সেটা তো ঠিক হয়নি।”

এ বছরের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে পারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছবি: বিবিসি বাংলা
দেখা যাচ্ছে, গত ১০ বছরে সাধারণ মানুষের কারো কারো হয়তো প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আবার অনেকের মধ্যে ক্ষোভও দেখা যাচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আকাংখা ও নতুন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আসছে নির্বাচনে নতুন কী প্রস্তাবনা ভোটারদের সামনে হাজির করবে আওয়ামী লীগ?

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলছিলেন, “২০০৮ সালে আমরা ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এখন সেসব উন্নয়ন দৃশ্যমাণ। আমার বিশ্বাস জনগণ ভোটের সময় এগুলো অবশ্যই বিবেচনা করবেন।”

“আমরা এখন উন্নয়নের স্বর্ণদুয়ারে প্রবেশ করেছি। এটা অব্যাহত রাখার বিষয় আছে। আমরা বলছি, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত। ২০৪১ সালে দেশ হবে সমৃদ্ধশালী।”

মি. রাজ্জাক বলছেন, তার ভাষায় দেশের চেহারা বদলে দিতে খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ ১০টি খাতে আরো ব্যাপক উন্নয়নের বিশদ প্রস্তাবনা তারা নাগরিকদের কাছে তুলে ধরবেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলছেন, উন্নয়ন অব্যাহত রাখার স্বার্থেই সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে। ছবি: বিবিসি বাংলা
কিন্তু এসব প্রস্তাব ২০০৮ সালের মতো তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কতটা ভূমিকা রাখবে?

বিশেষ করে নিরাপদ সড়ক বা কোটা সংস্কার নিয়ে তরুণদের একটা বড় অংশের ক্ষোভ-বিক্ষোভ আর তা দমনে সরকারের কঠোর মনোভাবের পর তরুণরা কি ব্যাপকভাবে মহাজোটকে সমর্থন করতে পারে?

মহাজোটের শরীক বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন অবশ্য মনে করছেন, নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের পক্ষেই পাবেন তারা।

“বাংলাদেশে মোট ভোটারের প্রায় ১৫% তরুণ। সুতরাং তরুণদের গুরুত্ব দিতেই হবে। তরুণদের ক্ষোভের পেছনে মূল কারণটা কী? সেটা হচ্ছে কর্মসংস্থান। আমরা এটার ব্যবস্থা করবো। এছাড়া কোটা সংস্কারের বিষয়টিও আশা করছি নির্বাচনের আগেই সমাধান হয়ে যাবে।”

এদিকে ইশতেহার তৈরির সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও গুছিয়ে আনছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু মহাজোটের শরীক দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা কতদূর?

মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলছেন, আসন ভাগাভাগি নিয়ে মহাজোটের মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনও আলোচনা শুরুই হয়নি। কিন্তু কেন?

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলছেন, মহাজোট থাকলে আওয়ামী লীগের কাছে ১শ আসন চাইবে জাতীয় পার্টি। ছবি: বিবিসি বাংলা
মি. কাদের বলছিলেন, “জাতীয় পার্টি মহাজোটের কাছে একশ’টি আসন চাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে আলোচনা শুরু হচ্ছে না। কারণ বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি। বিএনপি নির্বাচনে না আসলে সেক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বেরিয়ে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। আমরা সে প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছি।”

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি-না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা এখনো দেয়া হয়নি দলটির পক্ষ থেকে। অন্যদিকে এরই মধ্যে মহাজোটের বিপক্ষে কয়েকটি ছোট দলের একটি বৃহত্তর বিরোধী জোটও গঠন হয়েছে।

সেখানে বিএনপির যুক্ত হওয়া নিয়েও চলছে নানান আলোচনা। যদিও একে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না আওয়ামী লীগ।

“কয়েকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল জোট করেছে। ভোটের মাঠে তাদের গুরুত্ব কতটুকু সেটা আমরা বিশ্লেষণ করছি। ভোটের মাঠে আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। বিএনপি যদি নির্বাচনে আসে, তাহলে সেটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।”

”আমরা আশা করবো তারা নির্বাচনে আসবে। যদি বিএনপি ভোটে অংশ না নেয়, তাহলে আমার বিশ্বাস বিএনপি থেকে একটা বড় অংশ ভিন্ন নামে অথবা অন্য কোনভাবে নির্বাচনে আসবে,” বলছিলেন আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক।

আওয়ামী লীগ বলছে, নতুন কয়েকটি দলের সমন্বয়ে মহাজোটের আকার বৃদ্ধি করতে দলের মধ্যে কিছু পরিকল্পনা আছে। তবে বিএনপি ভোট বর্জন করলে মহাজোটে দলের সংখ্যা না বাড়িয়ে সেই দলগুলোকে আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরামর্শ দেবে আওয়ামী লীগ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রকাশের তারিখ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার।

Print Friendly, PDF & Email