বাঙালিনিউজ
পাকিস্তানের প্রেক্ষাগৃহে বলিউডের ছবি, টেলিভিশনে ভারতীয় সিরিয়াল, চলচ্চিত্র বা অন্য কোনো কনটেন্ট চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে

বাঙালিনিউজ
বিনোদনডেস্ক

এখন ভারত ও পাকিস্তানে পরস্পরকে না বলার মহড়া চলছে। চলছে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জেদাজেদি। এই হাওয়া লেগেছে দু’দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। চলচ্চিত্রশিল্পে চলছে যথাক্রমে ‘পাকিস্তানকে না বলুন’ বনাম ‘ভারতকে না বলুন’ প্রচারণা!

অবশ্য এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়, এর আগেও অনেকবার ভারতীয় ছবি নিষিদ্ধ করেছে পাকিস্তান। আর ভারতও পাকিস্তানি শিল্পীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যেন পাকিস্তানি শিল্পীরা আর পা রাখতে না পারেন বলিউডে। কিন্তু এবারে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আবারও নতুন সংকটের মুখোমুখি।

কারণ, এবার আয়োজন করে পাকিস্তানে চলছে ‘ভারতকে না বলুন’ প্রচারণা। থেমে নেই ভারতও। অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন (এআইসিডব্লিউএ) থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বরাবর আবেদনপত্র পাঠানো হয়েছে। মূল বক্তব্য, ‘পাকিস্তানকে না বলুন। পাকিস্তানি শিল্পীদের কঠোরভাবে বর্জন করুন।’

গত ৭ আগস্ট বুধবার ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়াকে বহিষ্কার করেছে পাকিস্তান। বাণিজ্য, কূটনীতি, রেল যোগাযোগের পর এবার সব ধরনের সাংস্কৃতিক লেনদেনও বন্ধ করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের তথ্য ও প্রচারণাবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ফিরদাউস আশিক আওয়ান টুইটারে লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের কোনো হলে বলিউডের ছবি চলবে না। শুধু তা-ই নয়, টেলিভিশনেও কোনো ভারতীয় সিরিয়াল, চলচ্চিত্র বা অন্য কোনো কনটেন্ট চালানো হবে না।’

অন্যদিকে এর বিপরীতে ভারতের এআইসিডব্লিউএ পাকিস্তানি শিল্পী ও কূটনীতিকদের নিষিদ্ধ করেছে। সব বাণিজ্যিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতি ঘটাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠিয়েছেন। অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুরেশ গুপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে এ অনুরোধ করেছেন।

গত ০৫ আগস্ট সোমবার কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তু‌লে দেওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানে যেমন তোলপাড়, তেমনই তার আঁচ এসে লেগেছে বলিউডেও। বিভিন্ন সূত্র বলছে, কাশ্মীরের অচলাবস্থা না কাটলে আপাতত সেখানে শ্যুটিং না করাই শ্রেয় বলে মনে করছে প্রযোজনা সংস্থা।

কাশ্মীরে শ্যুট হওয়ার কথা ছিল, এমন অনেক ছবির শ্যুট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভেস্তে যেতে পারে। যদিও পরিচালকেরা কাশ্মীরের পরিবর্তে অন্য কোনও শ্যুটিং স্পট বেছে নেবেন কি না সে বিষয়ে কিছু জানাননি। তবে প্রযোজনা সংস্থাগুলোর যে বেশ বড় অঙ্কের ক্ষতি হতে পারে সে বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।

ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ করা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তে দ্বিধা-বিভক্ত বলিউড তারকারা। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে কেউ স্বাগত জানিয়েছেন, কেউ আবার ভিন্ন মত পোষণ করেছেন।

তবে ৩৭০ বিলোপ নিয়ে কিছুটা আবেগতাড়িত অভিনেতা অনুপম খেরের মা দুলারি খের। মায়ের সেই আবেগঘন ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন অভিনেতা। একসময় কাশ্মীর থেকে বিতারিত হতে হয়েছিল সেখানকার আদি বাসিন্দা কাশ্মীরি পণ্ডিতদের। আর তাই কেন্দ্রের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের সিদ্ধান্তে খুশি সবচেয়ে খুশি কাশ্মীরি পণ্ডিতরা।

অনুপম খের ও তাঁর মা দুলারি খের নিজেও একজন কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে মানুষ। তাই মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তে উচ্ছ্বাসিত দুলারি খের। কাশ্মীর নিয়ে তাঁর মায়ের সেই আবেগঘন ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন অভিনেতা অনুপম খের। যেখানে উচ্ছ্বাসিত দুলারি খেরকে বলতে শোনা গেছে, “এই খুশিতে ১০ জন মেয়ের কন্যাদান করবেন তিনি। এটা তাঁর কাছে পূণ্যের কাজ। উনি কাশ্মীরে ফিরে গিয়ে নিজের পৈত্রিক বাড়িতে থাকতে চান, পূজো দিতে চান।” তবে শুধু দুলারি খেরই নয়, অনুপম খেরও অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ নিয়ে এটা তাঁর দেখা কাশ্মীর নিয়ে সেরা সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে, বলিউড অভিনেতা সাকিব সালিম জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল নিয়ে রীতিমত শ্লেষের সুরেই কেন্দ্রের সমালোচনা করেছেন। আর এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে গলা চড়াতে শুরু করেন নেটিজেনদের একাংশ। কেউ কেউ সাকিব সালিমকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হোক বলেও দাবি করেন।

পাক গায়ক আতিফ ইসলামও কাশ্মীর প্রসঙ্গ নিয়ে মুখ খোলেন। এরপর আতিফের বিরুদ্ধেও ফুঁসতে শুরু করেন নেটিজেনরা।ভূস্বর্গ নিয়ে মুখ খুললেন বলিউড অভিনেত্রী হুমা কুরেশি। তিনি বলেন, কাশ্মীরের পরিস্থিতি এই মুহূর্তে সংবেদনশীল। বিভিন্ন সময়ে কাশ্মীরের মানুষের যেভাবে রক্ত ঝরেছে (কাশ্মীরি পণ্ডিত, মুসলিম), সেই ক্ষতি অপূরণীয়। তাই কাশ্মীর নিয়ে যেকোন মন্তব্য করার আগে একটু ভেবে নিন বলেও আর্তি জানান হুমা।

হুমা কুরেশির ওই মন্তব্যের পরই তাঁকে কটাক্ষ করতে শুরু করেন নেটিজেনদের একাংশ। ভারতীয় জওয়ানরা যখন বার বার ওখানে শহিদ হন, তখন আপনার জ্ঞান কোথায় ছিল বলে প্রশ্ন তোলেন কেউ। আবার কেউ বলেন, ৩৭০ ধারা বিলোপের পর হুমা কুরেশিরই সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে বলেও কটাক্ষ করেন কেউ কেউ। যা নিয়ে পালটা কোনও মন্তব্য করেননি বলিউড অভিনেত্রী। ‘জলি এল এল বি টু’ অভিনেত্রীর পাশাপাশি অভিনেতা সঞ্জয় সুরিও কাশ্মীরের পরিস্থিতি সংবেদনশীল বলে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত উরি হামলার পর পাকিস্তানি অভিনেতাদের বয়কট করে বলিউড। এমনকী, ভারতের বাজারে পাকিস্তানি সিনেমাও আর চলবে না বলে ওই সময় জানানো হয়।

ভারতের সংবিধানে ৩৭০ ধারায় জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে ১৯৫০ সালের সংবিধানে, গত ০৫ আগস্ট ভারত সরকার তা বাতিল করে সরাসরি কেন্দ্রের শাসনের আওতায় নিয়ে এসেছে জম্মু ও কাশ্মীরকে। এ ছাড়া লাখাদকেও পৃথক করা হয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে। বিগত লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে জম্মু-কাশ্মীর অঞ্চল সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করবে ভারত সরকার।

উল্লেখ্য, জম্মু-কাশ্মীর সমস্যার শুরু অনেক আগে। সেই ১৯৪৭ সালেই আজকের ঘটনার বীজ বপন করা হয়। ভারতের ১৯৫০ সালের সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী বিশেষ মর্যাদার অধিকারী জম্মু ও কাশ্মীর। তবে এই ধারা নিয়ে টানাহেঁচড়া চলেছে অনেক।

পররাষ্ট্র, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ওই রাজ্যকে দেওয়া হয়েছিল। তাদের আলাদা পতাকা ছিল। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আলাদা সংবিধান ছিল। কালে কালে সব হারিয়ে অবশিষ্ট ছিল সাংবিধানিক ধারা ও কিছু বিশেষ ক্ষমতা। সর্বশেষ ৫ আগস্ট সেটাও নিয়ে নেওয়া হয়। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হওয়ার ফলে ক্ষমতা হারিয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ এখন ভারতের দুই রাজ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। ভারতের এ সিদ্ধান্তকে পাকিস্তান ‘একতরফা’ ও ‘অবৈধ’ বলে ঘোষণা দিয়েছে।

গত ০৪ আগস্ট রোববার থেকেই কাশ্মীরের ইন্টারনেট, টেলিফোন লাইন, মুঠোফোন নেটওয়ার্ক সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। সেই ধারা ভেঙে মিছিলের চেষ্টার সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক। চারপাশে আতঙ্ক আর থমথমে পরিস্থিতি। চলছে গণগ্রেপ্তার। নিউইয়র্ক টাইমস এই মুহূর্তে কাশ্মীরকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। আর এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত অবনতি ঘটেছে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের।

Print Friendly, PDF & Email