বাঙালিনিউজ

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ, ঢাকা

ভারতে ১৭তম লোকসভা নির্বাচন সাত দফায় শেষ করার ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সেই মোতাবেক গত ১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৯ প্রথম দফা, ১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা এবং ২৩ এপ্রিল মঙ্গলবার তৃতীয় দফা ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আজ ২৯ এপ্রিল সোমবার চতুর্থ দফায় ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে। এরপর ৬ মে সোমবার পঞ্চম দফা, ১২ মে রোববার ষষ্ঠ দফা এবং ১৯ মে রোববার সপ্তম দফায় ভোটগ্রহণ করা হবে। আর ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে ২৩ মে বৃহস্পতিবার।

আজ ৭২টি আসনে ভোটগ্রহণ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে বিহারে ৫টি, পশ্চিমবঙ্গে ৮টি, জম্মু-কাশ্মীরে ১টি, ঝাড়খন্ডে ৩টি, মধ্যপ্রদেশে ৬টি, মহারাষ্ট্রে ১৭টি, উড়িষ্যায় ৬টি, রাজস্থানে ১৩টি এবং উত্তর প্রদেশে ১৩টি আসন। জানা গেছে, ভারতের এই লোকসভা নির্বাচনে আজ ৯ রাজ্যে প্রায় ১২ কোটি ৭৯ লাখ ভোটার ৯৬১ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। এক লাখ ৪০ হাজার কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে। সকাল ৭টা থেকে এই ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, বিরতিহীন চলবে বিকেল ৬টা পর্যন্ত।

এই পর্বে ভারতের একাধিক মন্ত্রীর জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে। এর মধ্যে রয়েছেন বেগুসরাই আসনের প্রার্থী বর্তমান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং, মহারাষ্ট্রের ধুলের সুভাষ ভামরে, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান-দুর্গাপুরে সুরন্দরজিত সিং আলুওয়ালিয়া, আসানসোল আসনে বাবুল সুপ্রিয়।

বিজেপি সরকারের এসব হেভিওয়েট প্রার্থীর পাশাপাশি আজ বিরোধীদের কিছু হেভিওয়েট প্রার্থীরও জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে। তাদের মধ্যে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের ফারুকাবাদ আসনে কংগ্রেস প্রার্থী সালমান খুরশিদ, পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরে কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী, মুম্বাই দক্ষিণ আসনে কংগ্রেসের মিলিন্দ মুরলি দেওরা, বিহারের কারাকাটে রাষ্ট্রীয় লোক সমতা পার্টির প্রধান উপেন্দ্র কুশওয়ারার মতো সাবেক মন্ত্রী।

মুম্বাই উত্তর আসনে কংগ্রেস প্রার্থী উর্মিলা মাতন্ডকর, অনন্তনাগে পিডিপি প্রার্থী জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এবং সমাজবাদী পার্টির ডিম্পল যাদবের মতো হেভিওয়েটদেরও আজ ভাগ্য নির্ধারণ করবেন ভোটাররা।

এ ছাড়া এই চতুর্থ পর্বের ভোটে অন্য হেভিওয়েটদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে তৃণমূল প্রার্থী অভিনেত্রী মুনমুন সেন, বীরভূমে তৃণমূলের প্রার্থী অভিনেত্রী শতাব্দী রায়, বেগুসরাইয়ে সিপিআই প্রার্থী কানাইয়া কুমার, মধ্যপ্রদেশের ছিন্দওয়ারা আসনে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী কমলনাথের ছেলে কংগ্রেসের প্রার্থী নকুল নাথ, মুম্বাই উত্তর-মধ্য আসনে অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের বোন কংগ্রেস প্রার্থী প্রিয়া দত্ত এবং এই কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সাংসদ পুনম মহাজন।

ভারতের নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চতুর্থ দফায় যে ৭২ আসনে আজ ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে তার মধ্যে বিজেপির দখলে ছিল ৫৬টি আসন। কংগ্রেস জিতেছিল মাত্র ২টিতে। বাকি আসনগুলো ছিল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজু জনতা দলসহ কিছু আঞ্চলিক দলের দখলে।

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ৫৪৩টি আসনে এই সাত পর্বের ভোটে তিন দফায় ইতোমধ্যে ৩০৩টি আসনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। আজ চতুর্থপর্বসহ ৩৭৫টি আসনে ভোটগ্রহণ শেষ হচ্ছে। পঞ্চম ধাপে ৭ রাজ্যের ৫১ আসনে, ষষ্ঠ ধাপে ৭ রাজ্যের ৫৯ আসনে এবং সর্বশেষ ধাপে ভোট হবে ৮ রাজ্যের ৫৯ আসনে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ এই ভারতে ৯০ কোটি ভোটারের ভোটগ্রহণ শেষে সরকার গড়তে হলে কোনো দল বা জোটকে ২৭২টি আসন পেতে হবে।

প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে, লোকসভার মোট ৫৪৫টি আসনের মধ্যে দুটি সংরক্ষিত আসন বাদ দিলে ৫৪৩টি আসনের এই ভোটের লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন ৫ শতাধিক রাজনৈতিক দলের প্রায় ১০ হাজার প্রার্থী। নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রায় এক কোটি ১০ লাখ কর্মী ও কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন।

এর আগে প্রথম দফার নির্বাচন হয় ১১ এপ্রিল। ১৮টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৯১ আসনে ভোট হয়। সেদিন প্রথম ধাপে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের ৮টি আসন, মহারাষ্ট্রের ৭, বিহারের ৪, অরুণাচল প্রদেশের ২টি এবং আসামের ৫টি প্রদেশে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই দফায় ভোটার ছিলেন সোয়া ১৪ কোটি।

দ্বিতীয় ধাপে ১৩ রাজ্যের ৯৭ আসনে ভোট হয়। এসব আসনে ভোট ছিল প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি। আর প্রার্থী ছিলেন ১৬০০ জন। এরপর গত ২৩ এপ্রিল তৃতীয় ধাপে ১৪ রাজ্যের ১১৭টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

বহু ধর্ম-বর্ণের মানুষের এই দেশের এবারের নির্বাচনে এবার কে বা কারা বিজয়ী হবেন, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি যেভাবে রেকর্ড গড়ে ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে জিতেছিলেন, তার দল বিজেপি ও এনডিএ জোটকে নিয়ে, এবার সে ধরণের ‘মোদি হাওয়া’ নেই।

গত নির্বাচনে ৫৪৩ আসনের লোকসভার ভোটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২ আসনের চেয়ে ১০টি আসন বেশি পেয়েছিল বিজেপি। গতবার ২৮২টি আসনে বিজেপি এককভাবে জয়লাভ করে এবং জোটসঙ্গীসহ তারা মোট ৩৩৪টি আসনে বিজয়ী হয়। এর বিপরীতে কংগ্রেস এককভাবে মাত্র ৪৪টি আসনে বিজয়ী হয়। তাদের কাছাকাছি ৩৭টি আসন পায় জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এআই এডিএমকে এবং পশ্চিমবঙ্গে মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পায় ৩৪টি আসন।

এবারের লোকসভা নির্বাচনকে ২০১৪ সালের চেয়ে একটু ভিন্নভাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সেন্টার ফর ভোটার অপিনিয়ন অ্যান্ড ট্রেন্ডস ইন ইলেকশন রিসার্চ (সিভোটার) এক জনমত জরিপে বলেছে, এবার বিজেপি এককভাবে ২২২টি ও এনডিএ-সহ ২৬৭টি আসন পেতে পারে। ২০১৪ সালের তুলনায় এককভাবে বিজেপির ৬০টি ও জোটগতভাবে ৬৯টি আসন কমতে পারে। ফলে তাদের কেন্দ্রে সরকার গড়তে কষ্ট হতে পারে। অ্যাসেসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাকিট রিফর্মস (এডিআর) এর মতে, ভোটারা বিজেপির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন।

অন্যদিকে, জরিপে বলা হচ্ছে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস জোট ইউপিএ পেতে পারে ১৪২ আসন। তবে ইউপিএ-তে না থাকলেও ঘোর মোদিবিরোধী পশ্চিবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি, উত্তর প্রদেশের অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং দিল্লির আম আদমি পার্টি মিলে পেতে পারে ১৩৪ আসন। বিরোধীরা ভোটের পরও একজোট হলে সরকার গড়তে পারে।

এদিকে, আজ ভোটগ্রহণ অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ করতে ৫৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সাধারণ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ছাড়াও আছেন পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং বিশেষ পর্যবেক্ষক। নির্বাচন কমিশন বলেছে, এই প্রথমবার ইভিএমের সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে ভিভিপ্যাট মেশিন। তবে বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হচ্ছে। এবারের ভোট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে ভারতজুড়ে। নির্বাচনে কংগ্রেস-বিজেপির দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে।

Print Friendly, PDF & Email