বাঙালিনিউজ

বাঙালিনিউজ
জাতীয়ডেস্ক

ভারতের উড়িষ্যা ও অন্ধ্য প্রদেশে হারিকেনের শক্তি নিয়ে প্রচণ্ড বেগে আঘাত হেনেছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, আজ ১১ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে উড়িষ্যার গোপালপুর এবং কলিঙ্গপত্তমের মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত হানে। ঝড়ের গতিবেগ ছিল প্রাথমিকভাবে ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। ঝড়টির বাতাসের গতিবেগ রেকর্ড হয়েছে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত।

উড়িষ্যার গোপালপুর এবং কলিঙ্গপট্টনমের মধ্যে তিতলি প্রথমে আছড়ে পড়ে। এ সময় প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণহানির কোনো খবর মেলেনি। বিভিন্ন এলাকা থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদকরা জানাচ্ছেন, ঝড়ের পর বেশ কিছু সড়ক-মহাসড়কে গাছ-বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ে থাকতেও দেখা যায়। গোপালপুর ও বারহামপুর শহরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সর্বপ্রকার যোগাযোগ।

টাইমস অব ইনডিয়া জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় তিতলির কারণে উড়িষ্যার রাজ্য সরকার ১৮টি জেলায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। পুরী, খুরদা, কেন্দ্রপাড়া, জগৎসিংহপুর ও গঞ্জমে স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকালই বিপর্যয় মোকাবিলায় দফায়-দফায় বৈঠক করেছে উড়িষ্যা রাজ্য সরকার।

বাঙালিনিউজ

জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতায় বুধবারই দুই রাজ্যের উপকূলীয় জেলাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে তিন লাখেরও বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সকল স্কুল, কলেজ, চাইল্ডকেয়ার সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনী (এনডিআরএফ) ও উড়িষ্যা দুর্যোগ প্রশমন বাহিনী এরইমধ্যে ঝড়কবলিত এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এখনও সেনাবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়নি। প্রয়োজন হলে সেদিকেও যেতে পারে সরকার।

‘তিতলি’ আঘাত হানতেই অন্ধ্র প্রদেশের উত্তরাঞ্চল ও উড়িষ্যার দক্ষিণাঞ্চলে ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভি জানায়, ঝড় উপকূলের দিকে এগিয়ে আসতেই শুরু হয় টানা বর্ষণ। আর আঘাত করার পর উড়িষ্যার গানজাম, গজপতি, পুরি, খুর্দ ও জগতসিংপুর জেলা এবং অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলামসহ বেশ কিছু জেলায় শুরু হয় ভূমিধস।

জানা গেছে, তিতলি আঘাত হানতে পারে, এই আশঙ্কায় আগে থেকেই মোকাবিলায় সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল প্রশাসন। সমুদ্র সৈকতে কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি। ঝড়ের প্রভাবে বেশ কয়েকটি জায়গায় গাছ উপড়ে পড়েছে। বেহরামপুর- গোপালপুরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এনডিআরএফের দল পৌঁছেছে উপকূলবর্তী এলাকায়। উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পটনায়ক ঘূর্ণিঝড়ের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। তিনি এরইমধ্যে উপদ্রুত জেলাগুলোর কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষে পনিতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

বাঙালিনিউজ

এদিকে, উড়িষ্যার পাশাপাশি অন্ধ্র প্রদেশ উপকূলেও এই ঝড়ের প্রভাব পড়ে। কলিঙ্গপট্টনমে তিতলির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটার। অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম ও বাজরাপু কট্টুরুতেও ঝড়ের প্রভাব দেখা দিয়েছে। এ সময় কন্ট্রোলরুমে বসে সরিজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন তার ঝড়কবলিত এলাকার কর্মকর্তাদের।

ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশে। তার কিছুটা প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও পড়েছে। রাজ্যের আবহাওয়া অফিস বলছে, তিতলির অভিমুখ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের দিকে। তবে ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করার আগেই শক্তি হারিয়ে নিম্নচাপে পরিণত হবে। আগামীকাল ১২ অক্টোবর শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করবে সেই নিম্নচাপটি। তবে গতকাল বুধবার রাত থেকেই দিঘা সমুদ্র উপকূলে প্রবল জলোচ্ছ্বা্স হচ্ছে। এজন্য আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণবঙ্গে বেশ কিছু জায়গায় ভারি বৃষ্টির সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া ভবন সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের তেমন কোনও প্রভাব না পড়লেও, পুজোর আগেই ভোগাবে বৃষ্টি। নিম্নচাপটি মূলত পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলির একাংশ, উত্তর ২৪ পরগনার ওপর দিয়ে যাবে। এরপর বাংলাদেশের যশোর জেলায় ঢুকে যাবে নিম্নচাপটি। এর ফলে পাশ্ববর্তী বেশ কয়েকটি এলাকাতেও বৃষ্টি হবে। বর্ধমান, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, পুরুলিয়াতে বৃষ্টি হবে।

ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, স্থলভাগে ওঠার পর মোটামুটি ঘণ্টায় ১৭ কিলোমিটার বেগে অগ্রসর হচ্ছে তিতলি। ঝড়টি আরও উত্তরপশ্চিম দিকে সরে গিয়ে কিছুটা বাঁক নিয়ে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের দিকে অগ্রসর হবে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে কমতে থাকবে এর শক্তি।
আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শক্তি কমে এলেও বিস্তর বৃষ্টি ঝরাবে তিতলি। সেই সঙ্গে চলবে দমকা হাওয়া, যার জের চলবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাতেও।

বাঙালিনিউজ

এদিকে, ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় গতকাল বুধবার থেকেই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সঙ্কেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সেই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সারাদেশে অভ্যন্তরীণ রুটে নৌ চলাচল বন্ধ রাখতে বলেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা, ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিতলির প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বুধবার থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল বুধবার দিনের প্রায় পুরো সময় আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। তাপমাত্রাও গত কয়েক দিনের তুলনায় কমে এসেছে।

আজ ১১ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়োহাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে আসতে পারে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরের আট দেশের আবহাওয়া দপ্তর ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেলে ‘তিতলি’ নামটি প্রস্তাব করে পাকিস্তান। এর অর্থ প্রজাপতি।