বাঙালিনিউজ

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে সরকার গঠন করেছে। তবে মহাজোট কিংবা ১৪ দলীয় জোট সঙ্গীদের এখনো মন্ত্রিসভায় নেয়নি জোটের এই প্রধান দলটি। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচন জোট বেঁধে করলেও আওয়ামী লীগ জোট সঙ্গীদের বিরোধী দলে রাখতে চায়। কারণ, প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের সাংসদরা শপথ নেয়নি। হয়তো তারা সংসদে আসবে না।

তাই আওয়ামী লীগ জোটসঙ্গীদের সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসাতে চায়। যাতে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ তৈরি হয়। এরইমধ্যে মহাজোটে আওয়ামী লীগের বড় শরিক জাতীয় পার্টির চেয়াম্যান এইচএম এরশাদ সরাসরি প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সংসদের স্পিকারের স্বীকৃতিও নিয়েছেন। ভাই জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় উপনেতা বানিয়েছেন এবং দলের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমানকে বিরোধী দলের চিফ হুইপ ঘোষণা করেছেন।

যদিও জাতীয় পার্টির অনেকেই তাতে খুশি নন। তারা দশম জাতীয় সংসদের মতো সরকারে ও বিরোধী দলে দুটোতেই থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দলনেতা এরশাদ বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্তে অনঢ়, তাই কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছা কাজে আসেনি। আওয়ামী জোটসঙ্গী অন্যদেরও বিরোধী দলে রাখতে চায়। যাতে দশম সংসদের মতো না হয়ে একাদশ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ গড়ে ওঠে। যাতে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট কোণঠাসা হয়ে পড়ে রাজনীতিতে।

বাঙালিনিউজ

তবে যদ্দুর জানা গেছে, আওয়ামী লীগের জোট সঙ্গীরা বিরোধী দলে যেতে নারাজ। এক প্রতীকে ভোট করার পর এখন তারা বিরোধী দলে যেতে চায় না। তাদের বিরোধী দলে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ১৪ দলীয় জোটের নেতারা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তারা এখন জোটের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে মহাজোট গড়ে ভোটে লড়েছিল আওয়ামী লীগ। এই মহাজোটে ১৪ দলীয় জোটের বাইরে জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় পার্টি (জেপি), বিকল্প ধারা ছিল।

ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, সংসদের সরাসরি যে ৩০০ আসনে ভোট হয় তার মধ্যে ২৯৯টি আসনের ভোটে মহাজোট মহাবিজয় অর্জন করেছে ২৮৮ আসনে। আওয়ামী লীগে একাই জিতেছে ২৫৭টি আসন। বিপরীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জিতেছে মাত্র ৮টি আসনে। তার মধ্যে বিএনপি জিতেছে ৬টি আসনে এবং গণফোরাম ২টি আসনে।

বাঙালিনিউজ
মোহাম্মদ নাসিম জোট শরিকদের অবস্থান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এক কথায় বলেন, “এখন কিছু বলা যাবে না।”

এই পরিস্থিতিতে ২২ আসনে বিজয়ী এইচ এম এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিএনপিকে টপকে গেছে। বিএনপি সংসদে এলেও বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকবেন এরশাদ। তাই জাতীয় পাটি একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল হতে চায়। সরকারেরও তাতে স্বীকৃতি রয়েছে বলে জানা গেছে।

তাই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতবারের সরকারে জাতীয় পার্টিকে রাখলেও এবার রাখেননি। জোট শরিক কোনো দলের নেতাকেই মন্ত্রিসভায় রাখেননি তিনি।

মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির অবস্থান বিরোধী দলে ঠিক হলেও, ১৪ দলীয় জোটভুক্ত বিভিন্ন দল থেকে বিজয়ী ৭ জন এবং বিকল্পধারা থেকে বিজয়ী ২ জন সাংসদের অবস্থান নিয়ে কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি।

বাঙালিনিউজ
আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে ভোট করে বিজয়ী হয়েছেন রাশেদ খান মেনন

এদিকে আগামী ৩০ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। তার আগেই আওয়ামী লীগের অন্য জোট শরিকদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ ইঙ্গিত করছেন, জোট শরিক অন্য দলগুলোর বিজয়ী সাংসদরা বিরোধী দলের আসনে বসুন, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন সেটাই চাইছে। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল চাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

একটি অনলাইন পত্রিকা জানায়, আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেছেন, “উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলগুলো গঠনমূলক সমালোচনা করে সংসদে যে ভূমিকা পালন করে থাকে, তেমনভাবে আমরা জোট শরিক দলগুলোকেও শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চাই।

“তাই সংসদে বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে শিগগিরই শরিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হবে।”

বাঙালিনিউজ
হাসানুল হক ইনু দিয়েছেন কৌশলী উত্তর

কিন্তু ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, জেপি, তরীকত ফেডারেশনের নেতাদের বক্তব্যে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আপত্তি পাওয়া গেছে। ৩টি আসনে জয়ী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন মিডিয়াকে বলেছেন, “এই বিষয়টায় আমরা এখনও সমাধানে আসতে পারিনি। তবে আমরা যেহেতু ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে আছি, সেহেতু ১৪ দলেই থাকব। গণতন্ত্র রক্ষার আমাদের ভূমিকা থাকবে।”

বিরোধী দলের আসনে বসবেন কি না? এই প্রশ্নের জবাবে গত সরকারের মন্ত্রী হিসেবে সরকারি দলের আসনে থাকা মেনন বলেন, “না, আমরা ১৪ দলেই আছি।”

মেননের মতো ১৪ দল থেকে গত সরকারে মন্ত্রী ছিলেন জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তাদের দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দশম সংসদে সরকারি দলের আসনেই ছিলেন।

বাঙালিনিউজ
শেখ শহীদ মিডিয়াকে বলেন, “মহাজোট থেকে যারা নৌকা মার্কায় নির্বাচন করেছেন, তাদের বিরোধী দলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তার আগে নবম সংসদেও সরকারি দলের আসনে ছিল এই দলগুলোর নেতারা। সেবার শেখ হাসিনা জোট শরিক দল থেকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করেছিলেন সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়াকে।

মঞ্জুর দল জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম সরাসরিই বলেছেন, তারা বিরোধী দলে যাবেন না এবং অন্যদেরও বিরোধী দলে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শেখ শহীদ মিডিয়াকে বলেন, “মহাজোট থেকে যারা নৌকা মার্কায় নির্বাচন করেছেন, তাদের বিরোধী দলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর্টিকেল ৭০ অনুযায়ী বিরোধী দলে গেলে তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।

তিনি বলেন, “আমাদের পার্টি নির্বাচনে বাইসাইকেল প্রতীকে একটি আসন পেয়েছে। ইচ্ছা করলে আমরা বিরোধী দলে যেতে পারি, কিন্তু যেহেতু আমরা ১৪ দলীয় জোটে আছি, সেই হিসেবে আমরা বিরোধী দলে যাচ্ছি না।”

একটি আসনে জয়ী তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যন নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীও বিরোধী দলের আসনে বসতে আপত্তি নিয়ে এখন জোটনেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমরা বিরোধী দলে যাব কেন? আমরা সরকারের সঙ্গে আছি। আমাদের দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমরা বিরোধী দলে যাব না।”

বাঙালিনিউজ
তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যন নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীও বিরোধী দলের আসনে বসতে আপত্তি

এবারের নির্বাচনে আসন বণ্টনে ভাগে ‘কম’ পেলেও তাতে অসন্তুষ্ট নন মাইজভাণ্ডারী। তবে তিনি বলেন, “সরকারে সঙ্গে আমরা কাজ করছি, করে যাব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাজ করে যেতে বলেছেন। তিনি যা ভালো মনে করবেন, আমরা সেভাবেই থাকতে চাই।”

দুটি আসনে জয়ী জাসদের একাংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এ বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তিনি মিডিয়াকে বলেন, “আমরা ১৪ দলীয় জোটে আছি, জোটের সঙ্গে থাকব।”

বিরোধী দলে যাবেন কি না? এই প্রশ্নের জবাবে গত সরকারের মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, “সেই সিদ্ধান্তটা আমরা জোটগত ভাবে নিতে চাই। আরেকটা বৈঠক না হলে আমরা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারব না। ওখানে যা সিদ্ধান্ত হয়, তা আমরা পরে জানাব।”

এদিকে, ১৪ দলের মুখপাত্র আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম জোট শরিকদের অবস্থান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এক কথায় বলেন, “এখন কিছু বলা যাবে না।”

Print Friendly, PDF & Email