বাঙালিনিউজ
রাজধানী ঢাকায় ধানমণ্ডিতে মাইডাস সেন্টারে গতকাল সন্ধ্যায় বক্তৃতা করছেন ভারতের বিখ্যাত লেখিকা, বুকারজয়ী অরুন্ধতী রায়।

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারতের বিখ্যাত লেখিকা, বুকারজয়ী উপন্যাসিক ০৫ মার্চ ২০১৯ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত ‘কথোপকথন’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ সময় অরুন্ধতী বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের মানুষের জন্য এসেছেন। এ দেশে তাঁর যে পাঠক আছে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে থেকেই এখানে আসা।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম আলোকচিত্র উৎসব ছবিমেলায় তাঁর অনুষ্ঠান পর্বের নাম ছিল ‘আটমোস্ট এভরিথিং, অরুন্ধতী রায় ইন কনভারসেশন উইথ শহিদুল আলম’। অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি একটি লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এরপর তিনি শহিদুল আলমের প্রশ্নের জবাব দেন।

অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘আমার দুটো সত্তা। একটি লেখক সত্তা ও অন্যটি কর্মী সত্তা। লেখক হিসেবে আমি বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এসেছি’। কথোপকথনে অরুন্ধতী বাকস্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন, গণতন্ত্র, বড় বড় প্রকল্প ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলেন।

অরুন্ধতী বলেন, ‘আমি নদীকে কেন্দ্র করে বাঁধ কিংবা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বাসী নই। নদীকে ভাগ করা যায় না। বড় বড় বাঁধ নির্মাণের পেছনে ফ্যসিবাদ আর জাতীয়তাবাদী চেতনা লুকানো থাকে।’

লেখক ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতী বলেন, জাতীয়তাবাদের যে প্রচলিত ধারণা আছে। আমি তা ধারণ করিনা। আমি একজন ভ্রাম্যমাণ প্রজাতন্ত্রবাদী।

ভারতীয় এই লেখক মনে করেন, উপমহাদেশে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে যাওয়ার মূলে রয়েছে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস আর অর্থনীতির ভ্রান্ত ধারণা। “ধর্ম আর অর্থনীতি নিয়ে এত ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে মানুষের মনে! ক্রমেই বাড়ছে সন্ত্রাসবাদ। রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ বাড়ছে। আর তা মোকাবেলায় দেশগুলো যেন গণতন্ত্র ছেড়ে সামরিক পন্থা বেছে নিচ্ছে।”

তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানেই নির্বাচন না। গণতন্ত্র রক্ষা করা হয় কিছু মানুষের জন্য। আমি এ গণতন্ত্রের পক্ষে না। ভারতীয় উপমহাদেশে গণতন্ত্র চর্চার পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম, পরিবেশ, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনধারা নিয়ে কথা বলেন অরুন্ধতী; শোনান নিজের লেখক জীবনের গল্পও।

ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট, রামপালসহ নানা বিষয়ে জটিলতা প্রসঙ্গে ভারতের প্রগতিশীল গোষ্ঠী উচ্চকণ্ঠ নয় কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে অরুন্ধতী রায় বলেন, তিনি এ মন্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত। তিনি জেনে–বুঝে এ বিষয়গুলো নিয়ে লিখছেন। প্রয়োজনে এই ইস্যুতে তিনি বাংলাদেশে আসবেন।

উন্নয়নের প্রথাগত ধারণার বাইরে ভাবেন অরুন্ধতী। তিনি বলেছেন, অক্সফামের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভারতে ৫০ কোটি লোকের সম্পদ পুঞ্জীভূত ৯ জন লোকের কাছে। তাই উন্নয়নের কথা এলে লোকজন জানতে চায়, কার জন্য উন্নয়ন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সাহিত্যাঙ্গনেও। তবে কি প্রযুক্তির আধিপত্যে সাহিত্যের আবেদন কমবে? প্রশ্ন উঠেছিল এই অনুষ্ঠানে। অরুন্ধতী মনে করেন, সাহিত্যের উপাদান গুণগত মানসম্পন্ন হলে তার আবেদন কখনও ফুরাবে না।

“লেখালেখি করতে এলে অবশ্যই এবার লেখার গুণগত মান নিয়ে ভাবতে হবে। যা তা লিখে ফেললেই কিন্তু হবে না। পাঠককে ভালো কিছু দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকতে হবে। প্রযুক্তি যতই আসুক না কেন, পড়ুয়াদের কাছে সাহিত্যের আবেদন কিন্তু কখনও ফুরাবে না।”

অরুন্ধতী রায়ের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। পৈত্রিক সূত্রে বাংলাদেশের বরিশালে তাঁর শেকড়, বাবার বাড়ি। প্রথম উপন্যাসের ম্যান বুকার জয়ের ২০ বছর পর প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’।

২০ বছর বিরতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি আসলে এক মুক্ত মানুষ থাকতে চেয়েছি। এতটা চাপ নিতে চাইনি। প্রথম উপন্যাস লেখার পরই পরবর্তী উপন্যাস খুব দ্রুত প্রকাশ করে জনপ্রিয় হব, এই পুরস্কার পাব, সেই পুরস্কার পাব, এমনটা আমি কখনও ভাবিনি। এসব কঠিন ভাবনার মধ্যে আমি নাই।

“আমি ২০১২ সালে ভারতের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করি। রাজনীতির ভাবনাগুলো সব এক করে নিয়ে পরের উপন্যাসটি লিখতে শুরু করি সে সময়।”

ভারতের মাওবাদী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীলদের ধ্যানধারণার বিপরীতে অবস্থান নেওয়ায় তাকে ‘ভারতবিরোধী’ আখ্যাও পেতে হয়েছে একসময়। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধেও মতামত প্রকাশ করছেন তিনি।

অরুন্ধতী বলেন, “ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা চায়, আমি তাদের মতো কথা বলি। প্রথম দিকে ব্যাপারটা খুব খারাপ লাগত। আমার জাতীয়তাবাদ নিয়েও প্রশ্ন এসেছে বিভিন্ন সময়ে। আমার মতামত প্রকাশের পর চারপাশ থেকে ঘৃণাবাক্য বর্ষণ শুরু হল।”

প্রান্তিক হতদরিদ্র মানুষের উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বা এনজিগুলোর অর্থের জোগান কোথা থেকে আসে, সেদিকেও নজর রাখা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।

স্থাপত্যের ছাত্রী অরুন্ধতী প্রথমে ঝুঁকেছিলেন চলচ্চিত্রে। ১৯৮৫ সালে ‘মাসি সাহিব’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। পরে চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন। তার চিত্রনাট্য ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পায়।

প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ এর জন্য ১৯৯৭ সালে ম্যান বুকার পান অরুন্ধতী। তার দ্বিতীয় উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র উৎসব ‘ছবিমেলা’-য় যোগ দিতে অরুন্ধতী রায় সোমবার ঢাকায় আসেন।

Print Friendly, PDF & Email