বাঙালিনিউজ

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ, ঢাকা

আজ ০৮ আগস্ট ২০১৯ বৃহস্পতিবার, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। আর এই লড়াই-সংগ্রামে তাঁকে নেপথ্যে প্রেরণা যুগিয়েছেন মহিয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দীর্ঘ আপোষহীন লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির জনক এবং বিশ্ব বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর এই ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং সংগ্রামের সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর মহান ত্যাগী সহধর্মিনী ও বিস্ময়কর সাহসী বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী নারী ব্যক্তিত্ব বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

বেগম মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অনেক জটিল ও সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে তিনি অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাক হানাদার বাহিনী বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর পাকবাহিনীকে গ্রেফতার করে পরবর্তীতে পাকিস্তানে নিয়ে কারাবন্দি করে।

অন্যদিকে বেগম মুজিবকে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্য ও সন্তানদের সহ গৃহবন্দি করে রাখে পাক হানাদার বাহিনী, ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও। ১৭ ডিসেম্ভর তাঁদের পাকিস্তানিদের হাতে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয়।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিবের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা গর্ভবতী অবস্থায় একাত্তরে মায়ের সঙ্গে গৃহবন্দি ছিলেন। বন্দি অবস্থায় তাঁর প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম হয়। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ জয়লাভ করবে, সেই স্বপ্ন ও বিশ্বাস থেকেই বেগম মুজিব তাঁর ও স্বামীর প্রিয় জয়ধ্বনি ‘জয় বাংলা’ স্মরণে প্রাণপ্রিয় আদরের নাতির নাম রাখেন ‘জয়’।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পুরো রাজনৈতিক জীবনে ছায়াসঙ্গী হিসেবে সারাক্ষণ পাশে থেকেছেন, তাঁকে অনুসরণ করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর, ধৈয্য, সাহস এবং দেশপ্রেম ছিল বিস্ময়কর, অনন্য। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি দলের রাজনীতিক এবং ছাত্রনেতাদের নানাভাবে উপদেশ, পরামর্শ এবং সহযোগিতা দিয়েছেন। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু জেল থেকে যেসব নির্দেশ, পরামর্শ এবং কর্মসূচি ও সহযোগিতা দিতেন, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তা দলের নেতা-কর্মীদের জানিয়ে দিতেন।

দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু মুজিবের সঙ্গে বেগম মুজিব সকল রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের নেপথ্যে ভূমিকা রাখেন। তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সব ধরনের সহযোগিতা করেন। নিজের জমানো অর্থ এবং গহনা বিক্রি করে ছাত্রলীগের খরচ ও সম্মেলনে অর্থ যুগিয়েছেন। শুধু তাই না, তিনি নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি থেকে আয়ের টাকায় তিনি অনেক মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন, অনেক অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা দিয়েছেন, তাদের পাশে থেকেছেন।

ফজিলাতুন্নেছা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কাজে প্রেরণার অন্যতম উৎস। ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণার পর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান ও পূর্ব বাংলায় তাঁর অনুসারী এবং বশংবদদের কোপানলে পড়ে নানা নির্যাতন, হয়রানিসহ বন্দি জীবন-যাপন করছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুকে যেমন আপসহীন থাকার, ধৈর্য ধরার এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, তেমনি আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সাহস যুগিয়েছেন, নানা পরামর্শ দিয়েছেন ও সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছেন।

ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মীদের বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা পৌঁছে দিতেন ও লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যোগাতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নানা ঘটনায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকারের দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি বঙ্গবন্ধুর আইনিভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য আইনজীবীদের অর্থ জোগানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। এ সময় পূর্ব বাংলায় মুজিবের মুক্তির দাবিতে উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়েও দমাতে পারেনি।

বরং আন্দোলনের তীব্রতায় সরকার পিছু হটে। পাকিস্তান সরকার এ সময় লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্যারোলে মুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেন বেগম মুজিব। তিনি কারাগারে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোর বৈঠকে যোগ দিতে নিষেধ করেন। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ। ফজিলাতুন্নেছার পরামর্শে শেখ মুজিব অনড় থাকেন। ফলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

একইসঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেয়। পরদিন অর্থাৎ ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে বাংলার লাখ লাখ সংগ্রামী ছাত্র-জনতা। বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার জন্য শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। কারণ, বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় বাংলার মুক্তি সংগ্রাম নতুন গতি পেয়েছিল এবং আন্দোলন আরো ত্বরান্বিত হয়েছিল। তাঁর এই দূরদর্শি ভূমিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ব্যাপারেও অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের নেপথ্যে বঙ্গমাতার পরামর্শ ছিল অনন্য। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর সহচরদের অনেকে ৭ মার্চের ভাষণের ব্যাপারে নানা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেন। কিন্তু বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর অন্তরআত্মার ডাক শোনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোমার মন থেকে যা বলতে ইচ্ছে করে, যা বলা উচিত বলে মনে কর, জনসভায় তা-ই বলবে।

প্রিয়তমা স্ত্রীর পরামর্শই বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন। অন্য কারো পরামর্শ তিনি নেননি, লিখিত বক্তৃতাও দেননি। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণে ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে যে ‘স্বাধীনতার ডাক’ দিয়েছিলেন, তার পেছনে ছিল বঙ্গমাতার অসীম সাহসী ও মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ ছিল বাঙালির অন্যতম প্রেরণা ও জাতীয় চেতনার বীজমন্ত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আলোকবর্তিকা। আজও বাঙালির জীবনের ধ্রুবতারা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে জাতিসংঘসহ বিশ্বস্বীকৃত।

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ছিলেন বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম এক নেপথ্য অনুপ্রেরণাদাত্রী ও পরামর্শক। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে তিনি বঙ্গবন্ধুকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। প্রাণপ্রিয় স্বামী বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সব সময় হৃদয়ে ধারণ করেছেন, মনেপ্রাণে অনুসরণ করেছেন এবং তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নানা পর্যায়ে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন তিনি। এজন্য তাঁকে অনেক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে এবং অসংখ্য দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ বেগম মুজিবের জীবনী বিশ্লেষণ করলে বিদ্রোহী কবির এ কবিতার যথার্থ মর্মার্থ খুঁজে পাওয়া যায়, সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ১৯৩০ সালের ০৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল রেণু। তাঁর বাবার নাম শেখ জহুরুল হক ও মায়ের নাম হোসনে আরা বেগম। এক ভাই-দুই বোনের মধ্যে বেগম ফজিলাতুন্নেছা ছিলেন ছোট।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছার পিতা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক যশোরে কো-অপারেটিভ ডিপার্টমেন্টে অডিটর পদে চাকরি করতেন। প্রথম কন্যা বেগম জিনাতুন্নেছা (জিন্নি) এর ৫ বছর এবং কনিষ্ঠ কন্যা ফজিলাতুন্নেছা (রেণু) এর ২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। অল্পদিন পরে মাতা হোসনে আরা বেগমও মৃত্যুবরণ করেন।

এ সময় দুই নাবালিকা অনাথ মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পড়ে ৮০ বছরের বৃদ্ধ দাদা শেখ মো. আবুল কাসেমের ওপর। পিতৃমাতৃহারা শিশু ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান এবং মাতা সায়েরা খাতুনের আদরে পুত্র শেখ মুজিবসহ পরিবারের অন্য ভাইবোনের সঙ্গে বড় হন।

বাবা-মা মারা যাওয়ার পর, মাত্র ৫ বছর বয়সে পারিবারিক সিদ্ধান্তে কিশোর শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ফজিলাতুন্নেছার বিয়ে হয়। তখন শেখ মুজিবের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘বিয়ে কী তা তো বুঝলাম না। শুনলাম, রেণুর দাদা আমার আব্বাকে এক রকম হুকুম জারি করেছিলেন। মুরব্বিরা তাঁর কথা অবহেলা করার অবকাশ পাননি। সুতরাং বিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়ে গেল।’

ফজিলাতুন্নেছা শেখ মুজিবের ছোটবেলার সাথী হলেও, প্রকৃত জীবন সাথী হয়েছিলেন শেখ মুজিবের এন্ট্রান্স পাস করার পর। বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘তাঁদের বিয়ের ফুলশয্যা হয়েছিল ১৯৪২ সালে।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে এই মহীয়সী নারী দেশি-বিদেশি স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্রে ঘাতকদের গুলিতে স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল এবং দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল এবং দেবর শেখ নাসের সহ সপরিবারে নিহত হন।

এ ছাড়াও ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকরা যাদের হত্যা করে তাঁদের মধ্যে আরও ছিলেন ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগিনা শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর স্ত্রী আরজু মণি ও কর্নেল জামিল প্রমুখ।

শুধু তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেসময় পশ্চিম জার্মানি থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু ঘাতকরা এবং পরবর্তীতে তাদের পৃষ্ঠপোষক ও নেপথ্য পরামর্শক এবং সুবিধাভুগীরা বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে বাংলাদেশে ফিরে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার এই নির্মম ও বর্বর পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন কিছু পাকিস্তানপন্থি, রক্ষণশীল, মৌলবাদী এবং উচ্চাভিলাসী সেনা কর্মকর্তাসহ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদ। এছাড়াও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এই হত্যাযজ্ঞে সামরিক ও বেসামরিক আরো কর্মকতা এবং রাজনীতিক জড়িত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এই অভ্যুত্থান এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশি-বিদেশি পরাজিত শক্তির ইন্ধন ও সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও অনেক গবেষণা ও তথ্য-প্রমাণ এবং প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মম ও নৃশংসভাবে বর্বর ঘাতকরা সপরিবারে হত্যার পর, বাংলাদেশ কয়েক বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অশান্তির মধ্যে নিমর্জ্জিত হয়। অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ফলে দেশ অচল হয়ে পড়ে।

১৯৭৭ সালে আরেকটি অভ্যুত্থানের পর ১৫ আগস্টের প্রধান বেনিফিশিয়ারি অর্থাৎ ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী জেনারেল জিয়াউর রহমান সরাসরি ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৭৮ সালে জিয়া অবৈধ ভাবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে নিরাপত্তা অধ্যাদেশ জারি করেন এবং বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে অমানবিক, অসভ্য ও বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন বর্বর ও অবৈধ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ অন্তর্ভুক্ত করে ১৫ আগস্টের ঘাতকদের বিচার বন্ধ করে হত্যার দায়মুক্তি দেন।

বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ যেমন একই সুত্রে গাঁথা, তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও পরস্পর অবিচ্ছেদ্য নাম। ফজিলাতুন্নেছার শৈশবের সঙ্গী শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরা একই পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন এক ও অভিন্ন, ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে একইসঙ্গে ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিয়ে তাঁরা এই সত্য প্রমাণ করেছেন।

টুঙ্গিপাড়ায় একই পারিবারিক বন্ধনে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সাফল্য ও বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে বেগম ফজিলাতুন্নেছার অবদান চির স্মরণীয় এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অনন্য।

জাতির পিতার আমৃত্যু সঙ্গী, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী জাতীয়ভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে আজ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৯টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করছে। এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে দলটি। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ সকাল ৮টায় বনানী কবরস্থানে শহীদ ফজিলাতুন্নেসার সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ শেষে কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগও বনানী কবরস্থানে বেগম ফজিলাতুন্নেসার কবরে শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সবস্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাঙালির অহংকার, নারী সমাজের প্রেরণার উৎস। বঙ্গমাতা আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ সবসময় আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশ ও জাতির জন্য তাঁর অপরিসীম ত্যাগ, সহযোগিতা ও বিচক্ষণতার কারণে জাতি তাঁকে যথার্থই ‘বঙ্গমাতা’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

Print Friendly, PDF & Email