দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ, ঢাকা
২৬ আগস্ট ২০১৮ রোববার, পালিত হলো রাখিবন্ধন উৎসব। পৌরাণিক কাহিনী মেনে ভাইকে ভালোবেসে তার হাতে রাখি বাঁধে বোন। প্রচলিত ধারণা, এই রাখিবন্ধন ভাই-বোনের অমূল্য সম্পর্ক অটুট রাখে। আর সারাজীবন বোনকে নিরাপদে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় ভাই। এভাবেই রক্তের সম্পর্ক ও ভালোবাসার বন্ধন নিবিড় হয়।
শ্রাবণের শেষ পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় রাখিবন্ধনের অনুষ্ঠান। এটা একইসঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। কেউ কেউ বলেন, আর্যদের প্রভাবেই এই বাংলায় রক্ষাবন্ধন প্রচলিত হতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে অবাঙালি ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের আগমন ও বঙ্গভূমিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের ফলে তাদের দেখাদেখি রাখিবন্ধন বাংলায় জনপ্রিয় হতে থাকে।

তবে রাখিবন্ধনের চল কবে শুরু হয়েছিল, তা আজ আর জানার উপায় নেই। এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু এটা ঠিক, দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত এই রাখিবন্ধন প্রথা। শুধু ভারতেই নয়, রাখিবন্ধন উৎসব পালিত হয় নেপাল, পাকিস্তান, মরিশাসেও। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিন ভাই ও দাদাদের হাতে বিশ্বাসের ধাগা বেঁধে মিষ্টিমুখ করে বোন ও দিদিরা।

উত্তর ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে সহোদর ভাইবোন ছাড়াও জ্ঞাতি ভাইবোন এবং অন্যান্য আত্মীয়দের মধ্যেও রাখিবন্ধন উৎসব প্রচলিত। অনাত্মীয় ছেলেকেও ভাই বা দাদা মনে করে রাখি পরানোর রেওয়াজ রয়েছে।

রাখি ও রবীন্দ্রনাথ। ছবি সৌজন্যে ইন্ডিয়া টুডে ডট ইন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও রাখিবন্ধনে বন্ধুত্বকে বাঁধতে চেয়েছিলেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সৌভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কিন্তু ভাই-বোনের রাখিবন্ধন উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের নানা পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনী।

কবে থেকে বা কীভাবে শুরু হয়েছিল এই রাখিবন্ধন উৎসব, এ নিয়ে কিছু পৌরাণিক কাহিনীর পাশাপাশি কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

সংস্কৃত শব্দ ‘রক্ষা বন্ধন’ থেকেই প্রচলিত হয়েছিল ‘রাখি’ কথাটি। এই শব্দটির মধ্যেই আছে এর তাৎপর্য। অর্থাৎ রাখিবন্ধন মানে হচ্ছে রক্ষার বাঁধন। হিন্দু এবং শিখদের মধ্যে এই রাখিবন্ধন উৎসব ভাই-বোনেরা পালন করলেও, জৈনরা আবার একটু অন্যভাবে এই উৎসব পালন করেন। তাদের মধ্যে জৈন পুরোহিত ভক্তদের হাতে ‘ধাগা’ বেঁধে দেন রাখির দিনে।

পৌরাণিক কাহিনীতে জানা যায়, একবার সুর ও অসুরের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। দেবতাদের হয়ে লড়াই করছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন পরাক্রমশালী অসুররাজ বলি। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চললেও কোনও পক্ষই জিততে পারেননি।

দেবতা-অসুরদের সংগ্রাম চলছে, কিন্তু জয় কী ভাবে আসবে? এমন পরিস্থিতিতে ইন্দ্রের স্ত্রী শচী তথা ইন্দ্রাণী ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু শচীকে একটি পবিত্র সুতোর ধাগা দেন। অন্যদিকে দেবরাজ ইন্দ্র বৃহস্পতির কাছে জয়ের উপায় জানতে রওনা দিলে পথ আটকালেন তাঁর স্ত্রী ইন্দ্রাণী অর্থাৎ শচী। বললেন, তিনি জানেন জয়ের উপায়।

আর সেটা হচ্ছে, রক্ষাকবচ ধাগা। শচী পরের দিন শ্রাবণী পূর্ণিমার রাতে, স্বামীর হাতে বেঁধে দিলেন রক্ষাকবচ। সেই রক্ষাকবচই হল রাখি। তারপরই অসুরদের পরাস্ত করে অমরাবতী রক্ষা করেন ইন্দ্র। এই প্রথা মেনেই বহু যুগ আগে স্বামীরা যুদ্ধে যাওয়ার মুহূর্তে, হাতে এই ধাগা বেঁধে দিতেন স্ত্রীরা।

পৌরাণিক কাহিনীতে যেমন দেখা যাচ্ছে স্ত্রী রাখি বেঁধে দিয়েছেন স্বামীর হাতে। আবার এমন পৌরাণিক কাহিনীও পাওয়া যায় যে, শ্রীকৃষ্ণের কল্যাণ কামনা করে তাঁর মা যশোদা, রাখিপূর্ণিমার দিন পুত্রের হাতে রাখি পরিয়ে দিতেন।

সময় গড়িয়ে গেছে, রীতিও পাল্টে গেছে। এখন বোনেরা রাখি পরিয়ে দেন ভাইদের হাতে। তবে প্রাচীনকাল থেকেই সাধারণত নারীরাই পুরুষের হাতে রাখি পরিয়ে দিয়ে আসছেন। বোন ভাইকে রাখি পরায় অথবা ভাই ভেবে বরণ করে নিতে চায়, এমন কাউকেই রাখির বন্ধনে জড়িয়েছেন।

আবার এমন একটা সময় ছিল, যখন পুরোহিত প্রধানরা তাঁদের শত শত শিষ্যের হাতে রাখি পরিয়ে দিতেন। সুতরাং রাখিবন্ধন কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে চলেনি। নানা যুগে নানা ভাবে এর রীতিনীতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের পরিবর্তন হয়েছে।

ভগবৎ পুরাণের প্রচলিত কাহিনী মতে, একবার ভগবান বিষ্ণু ত্রী-ভুবন জয় করেছিলেন অসুররাজ বলিকে হারিয়ে। সেই হারের পর বিষ্ণুকে নিজের অট্টালিকায় থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন বলি। তাঁর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান বিষ্ণু। কিন্তু লক্ষ্মীদেবী চেয়েছিলেন স্বামী বিষ্ণু যেন শীঘ্রই বাড়ি ফেরেন। তাই বুদ্ধি করে বলিকে ভাই সম্বোধন করে, তাঁর হাতে রাখি বাঁধেন লক্ষ্মী। আর উপহার হিসেবে চেয়ে নেন বিষ্ণুকে। ভাই হিসেবে বোনকে দেয়া কথা রাখতে হয় বলিকে।

আরেক পৌরাণিক কাহিনী মতে, একবার এক হতদরিদ্র নারীর রূপ ধরে বলির কাছে আশ্রয় চান ধনদাত্রী দেবী লক্ষ্মী। বলি নিজের প্রাসাদের দরজা খুলে দেন তাঁর জন্য। খুশি হয়ে লক্ষ্মী, কাপড়ের টুকরো বেঁধে দেন বলির হাতে। দিনটি ছিল শ্রাবণ মাসের এক পূর্ণিমা।

অন্য একটি গল্পে রয়েছে, দৈত্যরাজা বলি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। বিষ্ণু বৈকুণ্ঠ ছেড়ে বালির রাজ্য রক্ষা করতে চলে এসেছিলেন। বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী স্বামীকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে বলিরাজের কাছে আসেন। লক্ষ্মী বলিকে বলেন, তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ। যতদিন না স্বামী ফিরে আসেন, ততদিন যেন বলি তাঁকে আশ্রয় দেন। বলিরাজা ছদ্মবেশী লক্ষ্মীকে আশ্রয় দিতে রাজি হন।

শ্রাবণ পূর্ণিমা উৎসবে লক্ষ্মী বলিরাজার হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। বলিরাজা এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে লক্ষ্মী নিজের সত্যি পরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলেন। এতে বলিরাজা মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। বলিরাজা বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেন। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিটি বোনেরা রাখিবন্ধন পালন করেন।

আরও প্রচলিত কাহিনী রয়েছে গণেশকে নিয়ে। গণেশের দুই পুত্র শুভ ও লাভ। কোনও বোন ছিল না তাঁদের। তাই শুভ ও লাভের ভীষণ আক্ষেপ ছিল। এক সময় বাবা গণেশের কাছে বায়না ধরেন, নিজেদের বোনের হাতে তাঁরা রাখি পরতে চান। উপায়ান্তর না দেখে, পুত্রদের মুখে হাসি ফোটাতে দুই স্ত্রী-ঋদ্ধি ও সিদ্ধির অন্তর নির্গত অগ্নি থেকে গণেশ সৃষ্টি করেন সন্তোষী মাকে। রাখিবন্ধনের দিনই নিজেদের বোনকে পেয়েছিলেন শুভ ও লাভ।

তবে ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের জনপ্রিয় ‘জয় সন্তোষী মা’ ছবিতে রক্ষাবন্ধন সংক্রান্ত একটি গল্প বলা হয়েছে। সেখানে রাখিবন্ধনের দিন গণেশের বোন তাঁর হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। এতে গণেশের দুই ছেলে শুভ ও লাভের হিংসে হয়।

কারণ, তাদের কোনো বোন ছিল না। তারা বাবা গণেশের কাছে একটা বোনের বায়না ধরেন। গণেশ তখন তাঁর দুই ছেলের সন্তোষ বিধানের জন্য দিব্য আগুন থেকে একটি কন্যার জন্ম দেন। এই দেবী হলেন গণেশের মেয়ে সন্তোষী মা। সন্তোষী মা শুভ ও লাভের হাতে রাখি বেঁধে দেন।

আরেক পৌরাণিক কাহিনী মতে, একবার শ্রী কৃষ্ণের আঙুল কেটে গেলে, দ্রৌপদী তাঁর গায়ের কাপড় ছিঁড়ে বেঁধে দিয়েছিলেন কৃষ্ণের আঙুলে। এতে কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান। দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয়া হলেও, তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং দ্রৌপদীকে যে কোনও বিপদেই তিনি রক্ষা করে এর প্রতিদান দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

বহু বছর পর, পাশাখেলায় কৌরবরা দ্রৌপদীকে অপমান করে তাঁর বস্ত্রহরণ করতে গেলে, কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতিদান দেন। এইভাবেই রাখিবন্ধনের প্রচলন হয়, এমন কথাও জানা যায়।

মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী কৃষ্ণের হাতে রাখি বেঁধেছিলেন। অন্যদিকে নিজের নাতি অভিমন্যুর রক্ষা কামনা করে রাখি বাঁধেন পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তী। যমুনাও তাঁর ভাই যমের হাতে রাখি বেঁধেছিলেন।

আবার রাখিবন্ধন সম্পর্কে একাধিক ঐতিহাসিক কাহিনীও আছে। একটি কিংবদন্তী অনুযায়ী, ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাবীর আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো (রাখি) পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন আলেকজান্ডারের ক্ষতি না করার জন্য বা তাঁর স্বামীকে হত্যা না করার আর্জি জানিয়েছিলেন।

পুরু ছিলেন কাটোচ রাজা। তিনি রাখিকে সম্মান করতেন। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নিজে আলেকজান্ডারকে আঘাত করেননি। জানা যায়, ওই যুদ্ধে আলেকজান্ডারের কাছে হেরে গিয়েছিলেন পুরু।

আরেক কাহিনীতে জানা যায়, শত্রুর হাত থেকে নিজের রাজ্য বাঁচাতে, মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন মেওয়ারের রানি কর্ণবতী। একইসঙ্গে সেই সময় তিনি একটি রাখিও পাঠিয়েছিলেন সম্রাট হুমায়ুনকে।

একটি জনপ্রিয় প্রচলিত ঐতিহাসিক কাহিনী অনুযায়ী, চিতোরের রানি কর্ণবতী ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে ওই রাখি পাঠান। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করলে, বিধবা রানি কর্ণবতী অসহায় বোধ করেন এবং তিনি হুমায়ুনকে রাখি পাঠিয়ে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেন। কর্ণবতীর রাখি প্রেরণে অভিভূত হয়ে হুমায়ুন চিতোর রক্ষা করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন।

তবে হুমায়ুনের সেনা পাঠাতে দেরি হয়েছিল। ফলে বাহাদুর শাহ রানির দুর্গ জয় করে নিয়েছিলেন। শোনা যায়, বাহাদুর শাহের সেনাবাহিনীর হাত থেকে সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য ১৫৩৫ সালের ৮ মার্চ রানি কর্ণবতী ১৩,০০০ পুরস্ত্রীকে নিয়ে জহর ব্রত পালন করে আগুনে আত্মাহুতি দেন।

তারপর চিতোরে পৌঁছে সম্রাট হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে দুর্গ থেকে উৎখাত করেন এবং কর্ণবতীর ছেলে বিক্রমজিৎ সিংকে সিংহাসনে বসান। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে রানি কর্ণবতীর রাখি প্রেরণের কথা অবশ্য জানা যায় না। কোনো কোনো ঐতিহাসিক রাখি পাঠানোর সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তবে মধ্য-সপ্তদশ শতকের রাজস্থানী লোকগাথায় রাখি পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু এসব পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক রাখিবন্ধন কাহিনী থাকলেও, রাখিবন্ধন বলতেই বাঙালির মনে পড়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস, লর্ড কার্জনের সেই বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের কথা। যার প্রতিবাদে বাঙালির প্রাণের মানুষ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজপথে নেমে রাখি বেঁধেছিলেন।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের শক্তির অন্যতম উৎস ছিল রাখিবন্ধন। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর কার্যকর হয় বঙ্গভঙ্গ। প্রতিবাদে বাঙালির ঘরে ঘরে রান্না বন্ধ। কলকাতায় হরতাল। শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি, অগণিত মানুষ মিছিল করে যান গঙ্গাতীরে। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ।

সবাই গঙ্গাস্নান করে পরস্পরের হাতে রাখি বেঁধে দিলেন। পরে সজনীকান্ত দাসকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সামনে যাকে পেলাম, তারই হাতে রাখি বেঁধে দিলাম। সরকারি কর্তাব্যক্তি, পুলিশ, কাউকেই বাদ দিলাম না। মনে পড়ে, একজন কনস্টেবল হাত জোড় করে বলেছিল, মাফ করবেন হুজুর, আমি মুসলমান।

কিন্তু সে দিন তো হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বলে কোনো বাছবিচার ছিল না। সে দিন তো ছিল রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ। সে দিন বাঙালি মাত্রই বেঁধেছিল রাখি। ঐক্যের রাখি।

তার আগে ওই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর কোলকাতার সাবিত্রী লাইব্রেরীতে ‘স্বধর্ম সমিতি’র বিশেষ অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ সভাপতির ভাষণে প্রস্তাব রাখেন, ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ওই আইন কার্যকর হলে, সেদিন কোন বাড়িতে রান্নাবান্না হবে না। বাঙালি জনসাধারণ অরন্ধন পালন করে উপোষ থাকবে। বাঙালির ঐক্য বজায় রাখার জন্য দেশজুড়ে হবে রাখিবন্ধন উৎসব। দিনটিকে ‘মিলন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাজনীতিকরা ওই তারিখে রাজধানী কলকাতায় হরতাল আহ্বান করে।

রাখিবন্ধন উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ রাখি-সঙ্গীত ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ূ, বাংলার ফল—পূণ্য হউক, পূণ্য হউক’ রচনা করেন। ৭ আগস্ট বাগবাজারে রায় পশুপতিনাথ বসুর সুরম্য প্রাসাদপ্রাঙ্গণে ‘বিজয়া সম্মিলনী’ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রিত হন।

বিজয়া সম্মিলনী মূলত হিন্দুদের অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথ লক্ষ করেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সব প্রতীকই হিন্দুদের প্রতীক থেকে গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রতীকের সাম্প্রদায়িক চরিত্র আছে। বঙ্গদেশ কেবল হিন্দুদের নয়, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান সবার, সব মানুষের দেশ। এতকাল সকল মানুষ এক সঙ্গেই আছে। বঙ্গদেশ ভাঙলে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান সবার এই বঙ্গদেশ ভাঙবে। কেবল হিন্দুর বঙ্গদেশ ভাঙবে না।

তাই বঙ্গভঙ্গ রদ করতে হলে সকল মানুষের অংশগ্রহণ চাই। এমন আন্দোলন চাই যেখানে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ অন্তর থেকে অংশ নিতে পারেন এই আন্দোলনে। রবীন্দ্রনাথ তাই স্পষ্টত ভেবেছিলেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের এই হিন্দু প্রতীকগুলো মুসলমানদের কাছে টানার বদলে আরও দূরে সরাবে। সুতরাং তিনি এই বিজয় সম্মিলনীতে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্ভাষণ করার আহ্বান জানান।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “হে বন্ধুগণ-আজ আমাদের বিজয়া-সম্মিলনের দিনে হৃদয়কে একবার আমাদের এই বাংলাদেশের সর্বত্র প্রেরণ করো। উত্তরে হিমাচলের পাদমূল হইতে দক্ষিণে তরঙ্গমুখর সমুদ্রকূল পর্যন্ত, নদীজালজড়িত পূর্বসীমান্ত হইতে শৈলমালাবন্ধুর পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত চিত্তকে প্রসারিত করো।

তিনি লেখেন, যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণে ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণ ফিরাইয়া আনিয়াছে, তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো।

তাই রাখিবন্ধনের কথা এলেই বাঙালির মনে পড়ে যায় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে কথা। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথকে, যে কবি জড়িয়ে আছেন আমাদের জীবনে, আমাদের মননে।

বঙ্গভঙ্গ মূলত ব্রিটশদের “ডিভাইড এন্ড রুল” পলিসির অংশ ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে প্রচণ্ড গণআন্দোলনের ফলে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়। কিন্তু তারপরও বঙ্গের ঐক্য রক্ষা সম্ভব হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাও বিভক্ত হয়েছে। এমনকি সোহরাওয়ার্দি-শরৎ বসুদের ঐক্যবদ্ধ বাংলা রাষ্ট্রের প্রস্তাবেও কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সাড়া মেলেনি।

ফলে ১৯৪৭ সালে দ্বিতীয়বার বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানে এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতে যুক্ত হয়। এই পূর্ববঙ্গই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ২৩ বছর লড়াই-সংগ্রামের পর, পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা-সার্বভৌম বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ নামে বিশ্বের মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক
dyutimoybulbul@gmail.com
প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট ২০১৮, সোমবার।

Print Friendly, PDF & Email