বাঙালিনিউজ

বাঙালিনিউজ
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

গতকাল ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রোববার রাতে, খুলনার রূপসা ব্রিজ এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পাঁচ বন্ধু। নতুন কেনা গাড়ি নিয়ে খুশিতে ঘুরতে বেরিয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফিরেছেন ছাত্রলীগ-যুবলীগের পাঁচ নেতা। এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে নিহতদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও তাদের নিজের দলসহ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা গোপালগঞ্জ শহর। স্বজন হরানোর আহজারি ও কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে নিহতদের বাড়ি ও আশপাশের এলাকা।

জানা গেছে, গতকাল ১০ ফেব্রুয়ারি রোববার গোপালগঞ্জ সদর থানা যুবলীগের সহসভাপতি সাদিকুল আলমের সদ্য কেনা প্রাইভেট কার নিয়ে খুলনায় বেড়াতে যান ছাত্রলীগ-যুবলীগের পাঁচ বন্ধু। রাত পৌনে ১২টার দিকে খুলনা থেকে গোপালগঞ্জে ফেরার পথে রূপসা ব্রিজের কাছে লবণচরা হরিণটানা এলাকায় তারা পৌঁছালে, সিমেন্টবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে তাদের প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন পাঁচ বন্ধু। প্রাইভেট কারটির মালিক সাদিকুল আলম নিজেই ছিলেন চালকের আসনে।

নিহত পাঁচজন হলেন সদর উপজেলার সবুজবাগের ওয়াদুদ মিয়ার ছেলে গোপালগঞ্জর জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক বাবু (২৬), সদর উপজেলার সবুজবাগের মৃত আলাউদ্দিন সিকদারের ছেলে ও সদর থানা যুবলীগের সহসভাপতি সাদিকুল আলম (৩২), থানাপাড়ার গাজী মিজানুর রহমান হিটুর ছেলে ও জেলা ছাত্রলীগের ছাত্র উপবৃত্তি–বিষয়ক সম্পাদক গাজী ওয়ালিদ মাহমুদ উৎসব (২৫), গেটপাড়ার রসুলপাড়ার আলমগীর হোসেনের ছেলে ও জেলা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সাজু আহমেদ (২৪), চাঁদমারি রোডে অহিদ গাজীর ছেলে ও সদর উপজেলা ছাত্রলীগের ছাত্রলীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অনিমুল ইসলাম (২৪)। সাদিকুল ছাড়া সবাই স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।

বাঙালিনিউজ

নিহতদের মধ্যে চার ছাত্রলীগ নেতার সবাই গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের ছাত্র। এর মধ্যে মাহবুব হাসান বাবু স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের, অনিমুল স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের, সাজু উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এবং উৎসবও একই কলেজের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উৎসব ও অনিমুল পরস্পরের আত্মীয়, সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা।

আজ সোমবার ভোররাত সাড়ে ৫টার দিকে তাদের লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে গোপালগঞ্জ শহরে নিয়ে আসা হয়। লাশগুলো রাখা হয় গোপালগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালে। আগে থেকেই সেখানে ছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা। এ সময় সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে সেখান থেকে লাশগুলো পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তাদের লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। আশপাশ থেকে ছুটে আসা প্রতিবেশীদেরও চোখের জল ফেলতে দেখা যায়। নিহতদের বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠীরা জানান, এরা পাঁচজন বন্ধুর মতো চলাফেরা করতেন। মাঝেমধ্যে তারা বেড়াতে যেতেন।

বাঙালিনিউজ
দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ি। ছবি: ফোকাস বাংলা

গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পাঁচ নেতার লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছার পর পরিবারগুলোয় চলছে শোকের মাতম। পাঁচ নেতার মৃত্যুতে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আজ সোমবার বাদ জোহর গোপালগঞ্জ শেখ ফজলুল হক মণি স্টেডিয়ামে নিহত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

শহরের থানাপাড়ায় দুর্ঘটনায় নিহত গাজী ওয়ালিদ মাহমুদ উৎসবের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় গোটা পরিবার। উৎসব জেলা আওয়ামী লীগ নেতা গাজী মিজানুর রহমানের ছেলে ও প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার গাজী হাফিজুর রহমানের ভাইয়ের ছেলে।

বাঙালিনিউজ
পাঁচ বন্ধুর লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবি: ফোকাস বাংলা

গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খান বলেন, ‘এই মর্মান্তিক মৃত্যু গোপালগঞ্জবাসীকে মর্মাহত করেছে। এই মৃত্যুতে গোপালগঞ্জে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আজ যে পাঁচটি ছেলে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, তাদের সামনে সোনালি স্বপ্ন ছিল। তাদের মৃত্যুতে জেলা আওয়ামী লীগ পাঁচজন ভবিষ্যৎ মেধাবী নেতা হারাল।’

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, পাঁচ বন্ধু একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে খুলনায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। গাড়িটি খুলনা মহানগরীর জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে গোপালগঞ্জ ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তিনি বলেন, খেজুরবাগান অতিক্রম করার সময় মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তি গাড়ির সামনে এসে পড়ে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে মোংলা থেকে আসা সিমেন্টবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে প্রাইভেট কারটির সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাইভেটকারে থাকা পাঁচ বন্ধু নিহত হন।

পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা এসে প্রাইভেটকারের ভেতর থেকে লাশ উদ্ধার করেন। পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ঘটনার পর থেকে ট্রাকচালক পলাতক। ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। পরে সেখান থেকে গোপালগঞ্জ নেওয়া হয়।

Print Friendly, PDF & Email