নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেছেন ইয়াজিদি মানবাধিকারকর্মী নাদিয়া মুরাদ এবং কঙ্গোর চিকিত্সক ডেনিস মুকওয়েজে। বিজয়ীদের সাথে নরওয়ের নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান বেরিট রেইস-অ্যান্ডারসেনও মঞ্চে। ছবি: এএফপি।

বাঙালিনিউজ
আন্তর্জাতিকডেস্ক

‘নারীর মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার স্বীকৃতি এবং যুদ্ধের সময়ও এর নিশ্চয়তা দেওয়ার মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণ বিশ্ব নির্মাণ সম্ভব’—এমন দর্শন থেকেই এবারের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হলো ইয়াজিদি নারী নাদিয়া মুরাদ এবং কঙ্গোর চিকিত্সক ডেনিস মুকওয়েজের হাতে।

জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বীভত্স নির্যাতনের শিকার এবং যুদ্ধে যৌন সহিংসতা রোধের লড়াইয়ে জোরালো কণ্ঠ একজন ইয়াজিদি নারী নাদিয়া মুরাদ। আর অন্যজন গত দুই দশক ধরে এমন বীভত্সতার শিকার নারী ও শিশুদের চিকিত্সা করছেন- এমন একজন চিকিত্সক ডেনিস মুকওয়েজে। ।

২০১৪ সালে আইএসের যৌনদাসী হিসেবে তাদের আস্তানায় তিন মাস বন্দী জীবন কাটাতে বাধ্য হন নাদিয়া। কোণঠাসা হয়ে পড়লেও জঙ্গিদের হাতে এখানো বন্দি অনেক অসগায় নারী।

নরওয়ের অসলোতে সোমবার নোবেল পুরস্কার নেওয়ার পর নাদিয়া তার বক্তব্যে সেই সব বন্দী মেয়েকে উদ্ধারে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। ২৫ বছর বয়সী নাদিয়া যখন কথা বলছিলেন, তখন মঞ্চেই ছিলেন ডা. ডেনিস। দুই দশক ধরে শত হুমকির মধ্যেই কাজ করে চলেছেন তিনি। এই নির্মম যাত্রায় মাত্র কয়েক মাস বয়সী ধর্ষিত শিশুর চিকিত্সাও তাঁকে করতে হয়েছে।

নোবেল কমিটির সভাপতি বেরিট রেইস-অ্যান্ডারসেন বলেন, ‘আজকের বিশ্বের সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর এই দুই ব্যক্তির। ন্যায়ের লড়াই তাঁদের এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। যদিও দুজনের অতীত একেবারেই ভিন্ন।’

নাদিয়ার জীবনের শুরুর গল্প একেবারেই সাদামাটা। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ইয়াজিদি অধ্যুষিত সিনজারের এক পার্বত্য গ্রামের অধিবাসী নাদিয়ার নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে ঝড় ওঠে ২০১৪ সালে আগস্টে। একদিন আইএস জঙ্গিরা কালো পতাকাবাহী গাড়ি নিয়ে কোচো গ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা গ্রামের পুরুষদের হত্যা করে এবং ধরে নিয়ে যায় নারী ও শিশুদের। নাদিয়াও তাদেরই একজন। নারীদের কায়িক শ্রম ও যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হয়। মসুলে তিন মাস দুর্বিষহ বন্দি জীবনে তিনি বারবার গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন, চলত অকথ্য মারধরও। অন্য অনেক ইয়াজিদি নারীর মতো তাঁকেও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এক জিহাদিকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়।

এত অত্যাচারের মধ্যেও নাদিয়া সব সময় পালানোর পথ খুঁজতেন, পেয়েও গিয়েছিলেন। মসুলের এক মুসলিম পরিবারের সহায়তায় তিনি ভুয়া পরিচয়পত্র নিয়ে ইরাকের কুর্দিস্তানে ইয়াজিদি আশ্রয়শিবিরে চলে যাওয়ার সুযোগ পান। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর মা ও ছয় ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরে তিনি এক সহায়তা সংস্থার মাধ্যমে জার্মানিতে বোনের কাছে চলে যান। এখন তিনি সেখানেই থাকেন।

তবে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে নাদিয়া নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তা কিন্তু নয়। ‘আমাদের জনতার যুদ্ধ’ শিরোনামের লড়াইয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। সেই লড়াই তাঁকে এনে দিয়েছে নোবেল শান্তি পুরস্কার। এর আগে তিনি অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের শাখারভ মানবাধিকার পুরস্কারও পেয়েছেন।

ডেনিসের গল্পটা একটু ভিন্ন। কঙ্গোর ৬৩ বছর বয়সী এই দক্ষ গাইনোকোলজিস্ট গত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ধর্ষণের শিকারদের চিকিত্সা করছেন। একই সঙ্গে চালাচ্ছেন কাউন্সেলিংও। তাঁর নিজ দেশ কঙ্গোয় গৃহযুদ্ধ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। অন্য যেকোনো লড়াইয়ের মতো এই সংঘর্ষেরও অন্যতম শিকার নারী। নিজ দেশে তাঁর পরিচয় ‘ডা. বিস্ময়’।

গত সপ্তাহে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘অশুভর বিরুদ্ধে লড়াই না করলে তা ক্যান্সারের মতো সমাজে ছড়াতে থাকে। একসময় পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দেয়।’ গতকাল নোবেল মঞ্চে তিনি বলেন, ‘যদি কোনো যুদ্ধে জড়াতেই হয়, তাহলে তা হোক বৈষম্যের বিরুদ্ধে, যা আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে ফেলছে।’ সূত্র: এএফপি।

Print Friendly, PDF & Email