বাঙালিনিউজ
নির্যাতন বোঝায়, এরকম চিত্রকর্ম। ছবি: ANDRÉ VALENTE

বাঙালিনিউজ
লাইফস্টাইল

আজকের যুগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নারী নির্যাতন। বিশ্বব্যাপীই দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাটা প্রকট। তবে আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার ও নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে। তাই শিক্ষিত সমাজ ও রাষ্ট্রগুলো নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নানা ধরনের সচেতনতামূলক উদ্যোগ নিচ্ছেন।

পারিবারিক সহিংসতা ও পারিবারিক জীবনে নারীর ওপর নির্যাতনকারী পুরুষদের শোধরানোর জন্য নানা কর্মসূচি ও সংশোধনীর উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পারিবারিক জীবনে নারীর ওপর নির্যাতনকারী পুরুষ কি কখনো শুধরায়? বিবিসি বাংলা তার এক প্রতিবেদনে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। এধরণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়েই মূল লক্ষ্যটা থাকে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা-কিন্তু নির্যাতনকারীর বিষয়টা নিয়ে কতটা চিন্তা করা হয়? তাদের মানসিক সাহায্য করার বিষয়টি কি কখনো চিন্তা করা হয়? আর নির্যাতনকারীদের আচরণে কি আদৌ পরিবর্তন আসা সম্ভব?

এরকম একজন নির্যাতনকারী অ্যান্ড্রু, যিনি চারিত্রিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিলেন, যখন তার সংসার ভেঙে যেতে বসেছিল। সঙ্গী এমা’র প্রতি তার ব্যবহার সবসময়ই অবমাননাকর ছিল। বেশ কয়েকবার এমাকে আহতও করেছিলেন অ্যান্ড্রু।

অ্যান্ড্রু’র নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর একসময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান এমা। পরবর্তীতে এমা তাদের সন্তানদের ভরণপোষণে হিমশিম খান। কিছুদিন পর তাদের সন্তানদের সরিয়ে নেয়া হয়, তাদের তত্বাবধান থেকে।

আচরণ পরিবর্তন

অ্যান্ড্রু’র সাথে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে নতুন করে যখন জীবন শুরু করার চিন্তা করেন এমা, তখন তাকে এই বিষয়ে সহায়ক নানা ধরণের কোর্স করতে বলা হয়।

অন্যদিকে অ্যান্ড্রুও একই ধরণের সহায়তা খুঁজছিলেন। এমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা বন্ধ করতে চাচ্ছিলেন তিনি-আর এবিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সাহায্যও খুঁজছিলেন।

ওই সময় ‘ফিনিক্স ডোমেস্টিক অ্যাবিউজ সার্ভিস’ নামক সংস্থার খোঁজ পান অ্যান্ড্রু, যারা এরকম নির্যাতনকারী পুরুষদের মানসিকতা ও আচরণ পরিবর্তনে সাহায্য করে থাকে।

ফিনিক্সে ৭ মাসের কোর্স শেষ করার পর, অ্যান্ড্রুর মনে হতে থাকে যে তার আচরণের পরিণাম ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছেন তিনি। প্রতি সপ্তাহেই তাকে তার ব্যবহার নিয়ে চ্যালেঞ্জ করা হতো এবং তখন তাকে নিজের আচরণের মুখোমুখি করা হতো।

কোর্সটিতে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয়, নানা ধরণের সমস্যার সমাধান করা এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে হতো-যার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা প্রিয়জনদের ওপর তাদের ব্যবহারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করার চেষ্টা করতেন।

“তখন আমি যে মানুষ ছিলাম, তা নিয়ে আমি মোটেও গর্বিত নই”, বলেন অ্যান্ড্রু।

বাঙালিনিউজ
যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। ছবি: GETTY IMAGES

এমাও জানান যে অ্যান্ড্রু’র পরিবর্তন তার চোখে পড়েছে। এমা বলেন, “সে অনেক বদলেছে। আমরা আগের চেয়ে বেশি কথা বলি, আর ও আগের চেয়ে বেশি শোনে।” তারা দুই বছরের জন্য আলাদা হলেও, এখন একসাথে বসবাস করছেন। সন্তানদের ফিরে পেতে চেষ্টাও করে যাচ্ছেন তারা।

ওই কোর্সে অ্যান্ড্রুকে সাহায্য করেছিলেন লিডিয়া। তিনি জানান, এরকম ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতা জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ, “নির্যাতনকারীর আচরণ শোধনের চেষ্টা না করা হলে, সাধারণত সে আরেকজন শিকার” খুঁজে বের করে। লিডিয়া বলেন, “তখন তাদের পরবর্তী সম্পর্কটিতেও এধরণের জটিলতার সৃষ্টি হয়”।

সবাই কি সংশোধন হয়?

এ ধরণের কোর্স শেষে অধিকাংশ মানুষের আচরণগত সংশোধন হলেও, সবার ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না। এরকম একটি কোর্স করার পর সারাহ’র (ছদ্মনাম) সঙ্গীর আচরণে কোনও পরিবর্তন আসেনি বলে জানান তিনি। সারাহ বলেন, “উল্টো সে আরো বেশি বদরাগী হয়েছিল”।

কোর্স চলাকালীন এবং কোর্স শেষ হওয়ার পরেও, বহুদিন চলেছিল সারাহ’র সঙ্গীর নির্যাতন। সারাহ মনে করেন, নির্যাতনকারীদের মানসিকতা ও চরিত্র সংশোধনে এরকম কোর্স যথেষ্ট নয়। বছরের পর বছর পূর্ণাঙ্গ থেরাপি দিয়ে এরকম সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্য প্রতিবছর আনুমানিক ৩ হাজার মানুষ এধরণের কোর্সে অংশ নেয় এবং এই সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। কিছু কোর্সে শুধু নির্যাতনকারীকে নিয়ে কাজ করা হয়। আবার কিছু কোর্স সাজানো হয় নির্যাতনকারী ও তার সঙ্গী দু’জনের জন্যই। তবে কোন পদ্ধতিটি যে অধিক কার্যকর, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছেই।

২০ বছর ধরে শুধু নির্যাতনকারীদের জন্য তৈরি করা একটি কোর্স পরিচালনা করে আসছেন ডেনিস। তিনি বলেন, যারা সংশোধিত হতে চায়, তাদের সংশোধনের সুযোগ দেয়া উচিত।

“তবে কিছু মানুষ থাকবেই যারা কখনোই সংশোধিত হতে পারবে না এবং কখনো সংশোধিত হবেও না। তবে অনেকেই আছেন, যারা আসলেই নিজেকে পরিবর্তন করতে চান এবং এই সুযোগটা তাদের প্রাপ্য”, বলেন ডেনিস।