bangalinews

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ, ঢাকা

কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালির প্রেমের কবি, যৌবনের কবি, মানবতার কবি, সাম্যের কবি। তবে বিদ্রোহী কবি হিসেবেই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, সমাদ্রিত। আর অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার দিক থেকে তিনি অনন্য, আপন স্বরূপে আপনি ধন্য।

নজরুলও নিজেকে বিদ্রোহী দাবি করেছেন। বলেছেন, আমি বিদ্রোহী …..। প্রেমের প্রতি তাঁর আনুগত্যও প্রশ্নাতীত। বলেছেন, প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম …। গেয়েছেন সাম্যের গান, বলেছেন মানবতার কথা-মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই ….।

নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা অতুলনীয়। উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের গালাগালিকে গলাগলিতে রূপ দিতে চেয়েছেন তিনি। আর সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অন্যায় অবিচার অত্যাচার ও অনিয়ম দূর করতে চেয়েছেন, প্রাণপণে। ছিড়তে চেয়েছেন ব্রিটিশ ভারতের পরাধীনতার শৃঙ্খল। কামনা করেছেন বাংলা ও বাঙালির জয়। তাই তো তিনি বলেছেন, জয় হোক বাংলার, জয় হোক বাঙালির।

ধর্মের নামে জাতি ও সম্প্রদায়ে বজ্জাতি-বেসাতি, হিন্দু-মুসলমানে হানাহানি, শাসক ও শোষকের শাসন-শোষণ, মানুষে মানুষে বঞ্চনা-প্রবঞ্চনা চাননি নজরুল। প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন, নির্মূল করতে চেয়েছিলেন। তাঁর গানে, কবিতায়, প্রবন্ধে, উপন্যাসে-সৃষ্টিশীলতার সকল ক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার জয়ধ্বনি। তাঁর জীবনাচারেও সেই বীজমন্ত্রের প্রতিধ্বনি। উন্নত মনন ও জীবনের জয়গান গেয়েছেন তিনি, চির উন্নত শিরে। তাই নজরুল বাংলার আপন জন। বাঙালির চিরদিনের সখা। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। এই মহান বাঙালি কবির আজ ১২০তম জন্মবার্ষিকী।

কাজী নজরুল ইসলাম জন্মেছিলেন বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ইংরেজি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে। তাঁর ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতার নাম জাহেদা খাতুন। বাবা ছিলেন মসজিদের ইমাম। নজরুলের শিশুকালেই মারা যান তিনি।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম নজরুলের। দারিদ্র্যের মধ্যেই শৈশব-কৈশোর কেটেছে তাঁর। পড়েছেন মক্তবে, একাধিক স্কুলে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর এগোনো সম্ভব হয়নি। মাত্র ক্লাস টেন পর্যন্ত। এর মধ্যেই জীবন ও জীবিকার তাগিদে লেটোদলে গান গেয়েছেন, নাটক ও যাত্রাপালা করেছেন, রুটির দোকানে শ্রমিকের কাজ করেছেন, রেল গার্ডের খানসামার কাজ করেছেন। যৌবনের শুরুতে বাঁচার তাগিদে সৈনিকও হয়েছেন, পাড়ি দিয়েছেন সুদূরে। সাংবাদিকতাও করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরেছেন আপন ঠিকানায়, সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে। সাহিত্য ও সঙ্গীত ভূবনে গড়েছেন বসতি। বসেছেন সৃজনশীল অমরত্বের আসনে, আপন মনে-স্বমহিমায়, সত্য ও সুন্দরের বীণা হাতে।

বাংলা কবিতায় নজরুলের আবির্ভাব একেবারেই ধূমকেতুর মতো। হঠাৎ করে এলেন, দেখলেন, জয় করলেন তিনি। বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলছেন। বাংলা সঙ্গীতের জগতে তিনি বাঁধনহারা, আলোকের ঝর্ণাধারা। বাংলা সঙ্গীত ও সাহিত্যে নজরুল নতুনধারার সৃষ্টি করেছেন। নিজস্ব যুগ, ভাব ও ভাষায় রাঙ্গীয়েছেন বাংলা ও বাঙালিকে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও প্রতিভার সাফল্য, উজ্জ্বল্য ও রহস্য নিয়ে গবেষণা হতে পারে দিবস ও রজনী, দীর্ঘদিন-দীর্ঘকাল।

সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের মতে, রবীন্দ্র-বলয়ের মধ্য থেকে বিস্ময়করভাবে বেরিয়ে নজরুল তাঁর গানে নবধারার সৃষ্টি করেছেন। স্বতন্ত্র রূপ, রস ও গন্ধ বিলিয়েছেন। তাঁর নির্মাণ শৈলীর ভিন্নতা ও বৈচিত্রতা ভিন্ন জগত সৃষ্টি করেছে। আলাদা বৈশিষ্ট্যে তাঁর সৃষ্টিকে অমর ও সমুজ্জ্বল করেছে।

নজরুলের অধিকাংশ গান সুর প্রধান। বৈচিত্রপূর্ণ সুরের লহরী কাব্যকথাকে তরঙ্গায়িত করে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সুরের বিন্যাসে কথামালা বিছানো। তার গানে রয়েছে গায়কের সুর-স্বাধীনতা। গায়ক সুরের ঢেউয়ে ভাসতে চাইলে নজরুলের গান হয়ে ওঠে রাগপ্রধান।

নজরুল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, নজরুল ইতিহাস ও সময় সচেতন ছিলেন। তাঁর লেখায় সময় ও ইতিহাসের প্রভাব সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তরঙ্গ নজরুলের সাহিত্যে আছড়ে পড়েছে। বিপুল জায়গা করে নিয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে নজরুল অন্যতম প্রধান কবি বা বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। গান ও কবিতা তাঁকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখবে। বিশেষ করে গান নজরুলকে অমরত্ব দিয়েছে।

নজরুলের কবিতা, গান ও সাহিত্য কর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছে, নবযুগ সৃষ্টি করেছে। লেখক হিসেবে নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ। গান, কবিতা সহ তাঁর সব লেখনি ভারতবর্ষে জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা। নজরুলের কবিতা ও গান মানুষের শোষণ ও বঞ্চনা মুক্তির চিরপ্রেরণা। প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে বাঙালি চেতনা ও প্রেরণার অন্যতম উৎস নজরুলের গান ও কবিতা সহ তাঁর সৃষ্টি সম্ভার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের গান ও কবিতা ছিল বাঙালির শক্তির অন্যতম আধার।

তাই হাজার বছরের স্বপ্ন, সাধনা ও সংগ্রামের ফসল স্বাধীন, সার্বভৌম বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসেন, ১৯৭২ সালের ২৪ মে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবির বাংলাদেশে বসবাসের ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধু। ধানমন্ডিতে কবির জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে, তাদের লেলিয়ে দেওয়া ক্ষমতালোভী ও উচ্চাভিলাসী ঘাতকদের হাতে নিহত হওয়ার এক বছর পর, ১৯৭৬ সালে এই শোকের মাসেই ২৯ আগস্ট (১২ই ভাদ্র, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাঙালির মহান কবি-চির বিদ্রোহী, চির প্রেমিক নজরুল। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। সেখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। বাঙালি তাঁকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করছে অন্তরের গহীন-গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তির সমসত্ত্ব দ্রবণে।

কারণ, বাঙালির সাহস ও শক্তির অন্যতম ঠিকানা নজরুল। তাই প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নজরুলের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বাঙালির সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’ অথবা ‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-’।

তাই তো নজরুল লিখেছেন, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেবনা ভুলিতে …’। না, তিনি ভুলতে দেননি। বাঙালিও তাঁকে ভুলতে পারেনি। পারবেও না কোনও দিন। তাঁর গান, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস-সর্বপরি তাঁর বিদ্রোহী সত্ত্বা, প্রেমিক হৃদয়, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার প্রেরণা-যে অগ্নিবীণার সুর ও ঝংকার বাঙালি প্রাণের তারে তিনি তুলে দিয়েছেন, তা চিরদিন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে, বাঙালির ঘরে-বাইরে, অন্তরে অন্তরে।

দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক।
প্রকাশের তারিখ: ২৫ মে ২০১৯, শনিবার।

Print Friendly, PDF & Email