বাঙালিনিউজ
প্রতিবেদন ডেস্ক

দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা বর্ষণের পাশাপাশি উজান থেকে প্রবল স্রোত নেমে আসায় ধেয়ে আসছে বন্যা তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যার্ত মানুষের আহাজারিও শুরু হয়েছে।

লালমনিরহাট: টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় নতুন করে দেখা দিয়েছে বন্যা।

জেলার আদিতমারী মহিষখোচা ও হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারীর ধুবনী এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ পানির তোড়ে ভেঙে গেছে।
এদিকে তিস্তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করায় নদীটির চরাঞ্চলে বিশেষ সর্তকতা জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান।

আজ ১২ জুলাই ২০১৯ শুক্রবার সকাল ৯টায় তিস্তার পানি প্রবাহ দোয়ানি পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আর ধরলার পানি কুলাঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এর আগে গতকাল ১১ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে বন্যা পরিস্থিতি দেখতে হাতীবান্ধার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখেন লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর। এ সময় তিনি পানি বন্দি লোকজনের সঙ্গে তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। ভাঙা রাস্তা মেরামতের জন্য ৫ হাজার বালির বস্তা বরাদ্দ দেন তিনি। এছাড়াও জেলায় ৬৮ টন চাল ত্রাণ হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এলাকাবাসী জানান, উজানের পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত ৫ দিনের ভারি বৃষ্টি। এতে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার তিস্তা ও ধরলা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। জেলার ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের নৌকা বা ভেলা ছাড়া সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ধেয়ে আসছে পানির স্রোত। এতে বড় সমস্যায় পড়েছে শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীরা।

চার দিকে অথৈ পানির কারণে গবাদি পশুপাখি নিয়ে অনেকটা বিপদে পড়েছেন চরাঞ্চলের খামারি ও চাষিরা। গত দুই দিন ধরে উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট এ বন্যায় জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী, সিংগিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলার নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এসব ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার পরিবার মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

বান্দরবান: ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে শহরের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শহরের আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগর, হাফেজঘোনা, ইসলামপুর, লাঙ্গিপাড়া, ওয়াপদা ব্রিজ, মিসকি সেতু ও বাসস্টেশনসহ নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে।

অন্যদিকে লামা উপজেলার লাইন ঝিড়ি ও লামা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের বাজালিয়া এলাকায় সড়কে পানি আরও বেড়েছে। ফলে বান্দরবানের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিছিন্ন আছে।

ফেনী: তিন দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার মুহুরী নদীর ১২টি স্থানে বাঁধ ভেঙে দুই উপজেলার ১৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জহির উদ্দিন জানান, ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার মুহুরী নদীর ১২টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

রাঙামাটি: রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে উপজেলার ৬টি গ্রামের এক হাজারের অধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং করা হচ্ছে। সবাই যাতে নিরাপদ স্থানে চলে যায় সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা বার্তা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলে বৃদ্ধি পাচ্ছে কাচালং নদীর পানি। তাতে প্লাবিত হচ্ছে বাঘাইছড়ির নিম্নাঞ্চল। বর্ষণে উজান থেকে নামছে পাহাড়ি ঢলের স্রোত। পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

নেত্রকোনা: টানা বৃষ্টিতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফুলে উঠছে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরী। দুই দিন ধরে বৃষ্টিতে দ্বিতীয়বারের মতো নদীটি ফেঁপে উঠেছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি।

নীলফামারী: উজানের ঢল আর ভারি বর্ষণে নীলফামারীতে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার সকালে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ডালিয়ার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সকাল থেকে বাড়তে থাকে তিস্তার পানি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের সবকটি জলকপাট (৪৪টি) খুলে রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

সুনামগঞ্জ: চার দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় জেলার সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার ও ধর্মপাশা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাসহ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। বন্যার পানিতে ওইসব এলাকার অনেক রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। পানি উঠেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়িতে। পানিতে ভেসে গেছে অনেকের চাষ করা মাছ। রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে কোনো কোনো এলাকা। গতকালও প্লাবিত হয়েছে সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগর, কাজিরপয়েন্ট, উকিলপাড়া ও তেঘরিয়াঘাট এলাকা। পানি উঠতে শুরু করেছে শহরের প্রধান বিপণিকেন্দ্র মধ্যবাজারেও।

মানিকগঞ্জ: যমুনা নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে দৌলতপুর ও শিবালয়ে নদীভাঙন। এরই মধ্যে ভাঙনের শিকার হয়েছে শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়ন ও দৌলতপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের শতাধিক বাড়িঘর, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও বহু ঘরবাড়িসহ ফসলি জমি। বাঁচামারা উত্তরখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবনও ভাঙনের কবলে রয়েছে।

এদিকে বন্যার পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে শুক্রবার দুপুরে সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেছেন প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

তিনি বলেন, বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এজন্য ১০ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ৬২৮টি পয়েন্ট ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, এর মধ্যে ২৬টি পয়েন্ট ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’। তবে সরকার ৫২১টি পয়েন্টকে ঝুঁকিমুক্ত করতে দ্রুত কাজ করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী জানান, মানিকগঞ্জ ও জামালপুরে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। লালমনিরহাটেও তিস্তায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে এসব মোকাবিলায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

Print Friendly, PDF & Email