বাঙালিনিউজ
আন্তর্জাতিকডেস্ক

ইমরান খান হবেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল। সেনাবাহিনী যা বলবে, তাকে তাই অনুসরণ করতে হবে। তাকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা সাজানো হয় দুই বা তিন বছর আগে। এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী ও সাংবাদিক রেহাম খান। গতকাল ২৮ জুলাই ২০১৮ শনিবার তিনি ভারতের অনলাইন ‘দ্য হিন্দু’কে লন্ডন থেকে টেলিফোনে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সুহাসিনি হায়দার।
পাকিস্তানের সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে সর্বাধিক আসনে জয়লাভ করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। এই দলের প্রধান পাকিস্তানের ক্রিকেট সুপারস্টার থেকে বর্তমানে রাজনীতির সুপারস্টার ইমরান খান।

তবে গত ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনকে জালিয়াতির নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেছেন রেহাম খান। তিনি অভিযোগ করেছেন জালিয়াতির নির্বাচনের সুবিধা পেয়েছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। রেহাম খান সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি-বিশেষ করে ভারত ইস্যুতে, ইমরান খানের নীতি হবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইচ্ছা অনুযায়ী। এখানে সংক্ষেপে ওই সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: নির্বাচনে পিটিআইয়ের পারফরমেন্সে আপনার প্রতিক্রিয়া কি, বিশেষ করে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে ইমরান খান বিজয়ী হওয়ায়?

উত্তর: ফল কি হবে তা আমি জানতাম। কিন্তু আমি এটাও জানি, নির্বাচন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু হতো, তাহলে ইমরানের জেতার কোনো সুযোগই থাকতো না। খাইবার পখতুনখাওয়া প্রদেশ-সহ এতোসব স্থানে এই দলটির এতো ভালো করা অসম্ভব। কারণ, ওইসব স্থানে পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকার ভীষণ অজনপ্রিয়। লাহোর ও করাচির মতো অন্য স্থানগুলোতে যা ঘটেছে, তা অবিশ্বাস্য। কারণ, সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা পিটিআইয়ের আনকোরা মুখের কাছে পরাজিত হয়েছেন।

প্রশ্ন: আপনি তো ইমরানকে সেনাবাহিনীর প্রার্থী বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতায় যারা আসছেন, তারা সবাই কি সেনাবাহিনীর আশীর্বাদ পেয়েছেন?

উত্তর: অবশ্যই। আপনি যদি ২০১৩ সালের কথা স্মরণ করতে পারেন, তাহলে আপনার মনে থাকার কথা যে, তখন ইমরান খান বলেছিলেন নওয়াজ শরীফ হলেন সেনাবাহিনীর প্রোডাক্ট। তাই তিনি বুঝতে পেরেছেন এটা কি জিনিস। আমার মনে হয়, এবার সেনাবাহিনী তাদের ক্ষমতা দেখাতে চেয়েছে। আর সেটা করেছে ইমরান খানকে খুব বেশি সমর্থন দিয়ে।

কারণ, নওয়াজ শরীফ যখন নিজেকে ভারতের দিকে এবং চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের দিকে পরিচালিত করেছেন, তখন সেনাবাহিনী হতাশ হয়েছে। তখনই তারা তার বিদায়ের পথ তৈরি করতে থাকে। আর ইমরান হয়ে ওঠেন হাতের আদর্শ পুতুল। জটিল অনেক ইস্যু সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই। তাকে সেনাবাহিনীর ইচ্ছাকে অনুসরণ করতে হবে।

প্রশ্ন: আপনার লেখা বই ‘রেহাম খান’-এ আপনি বলেছেন, ইমরান খানকে সৃষ্টি করেছে সেনাবাহিনী। কিন্তু তিনি তো ২০০৮ সালে সেনাবাহিনীর অধীনে নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। তাহলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ককে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

উত্তর: একজন স্ত্রী হিসেবে তাকে দেখেছি। তার কথা শুনেছি। ইমরান সব সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকা নিয়ে কথা বলতেন। ২০০৮ সালে তিনি নির্বাচন বর্জন করেছিলেন বিরূপ পরিস্থিতিতে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তারা তাকে সমর্থন দেবে না। কিন্তু যখন আমি তাকে জানতে পারি তখন তিনি সব সময়ই তাদের সমর্থনের কথা বলতেন। তিনি সব সময়ই এতোটাই নিশ্চিত থাকতেন যে, তিনি একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমি মনে করি তাকে ক্ষমতায় আনার এই পরিকল্পনা হয়েছিল দুই থেকে তিন বছর আগে।

প্রশ্ন: যখন ভারত এসেছিলেন তখন ইমরান খান বলেছিলেন, পাকিস্তানিদের সঙ্গে যতটা সম্পর্ক আছে, তার চেয়ে ভারতীয়দের সঙ্গে তার যোগাযোগ বেশি আছে। তাহলে ইমরান খান ভারত ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিষয়ে কি নীতি গ্রহণ করবেন বলে আপনার মনে হয়?

উত্তর: হ্যাঁ। তিনি ভারতে প্রচুর সময় কাটিয়েছেন। তার অনেক বন্ধু আছে। এ জন্যই আমি মনে করি নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি ভারতের সমালোচনা করেন নি। এটা অত্যন্ত ভন্ডামি। ভারতের সঙ্গে তিনি সুস্থ সম্পর্ক চান, আমরা সেটা ভাবতে পারি। কিন্তু নওয়াজ শরীফ যখন ভারতের সঙ্গে ব্যবসায় সম্পর্ক বৃদ্ধি করছিলেন, তখন সে বিষয়ে তিনি কি বলেছিলেন? তিনি নওয়াজ শরীফকে ‘গাদ্দার’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। আসলে তার কাছে কোনো আদর্শ নেই। তাই তাকে যা করতে বলা হবে, তিনি তাই করবেন। হোক সেটা ভারত বা পাকিস্তান ইস্যুতে।

প্রশ্ন: অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে, আপনার বইয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এজেন্ডা আছে। আপনি কি নূন্যতন আশা করেন এটা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে?

উত্তর: হ্যাঁ, অনেক মানুষই বলেছেন, আমি বইটি লিখেছি পিএমএল-এন’র পক্ষে। কিন্তু এই কথাটি সত্য নয়। সাংবাদিক হিসেবে আমি নওয়াজ শরীকে প্রথমবার চিনতে পারি, যখন আমি তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। আমি জেমিমা হতে চাই নি। নির্বাচনে যখন বিজয়ী হন নি, তখন আমি ইমরান খানকে বিয়ে করেছিলাম। আমি একজন পাকিস্তানি। একজন আত্মনির্ভরশীল নারী। আমি জেমিমার মতো না। ইমরান যখন ব্লাসফেমি আইন নিয়ে হঠকারিতা করেন, তখন তার পাশে আমি থাকতে চাই নি।

প্রশ্ন: আপনি কি পাকিস্তানে ফিরবেন? রাজনীতিতে যোগ দেবেন?

উত্তর: পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে আমি বাঁচতে পারি না। হ্যাঁ, আমি ফিরবো। এ জন্য আমার বাচ্চারা আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ও ক্রেজি বলে। কিন্তু আমি ফিরে আসবো পাকিস্তানে। আর রাজনীতি? এখনও এ নিয়ে ভাবি নি।

নির্বাচনের আগে থেকেই একটার পর মারাত্মক মন্তব্য করে ইমরান খানকে বিব্রত করেছেন প্রাক্তন স্ত্রী রেহাম খান৷ তাঁর আত্মজীবনী ঘিরে সাড়া পড়েছে আন্তর্জাতিক মহলে৷ বইতে তিনি বিভিন্ন সময় ইমরানের চারিত্রিক বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করেছেন৷

‘ইমরান খান সেনার বুট পালিশ করতে তৈরি’

এদিকে ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেহাম খান বলেন, পাক সেনা একজন নির্ভরযোগ্য লোক পেয়েছে৷ ইমরান খান সেনার বুট পালিশ করতে তৈরি৷ এটা যতদিন চলবে ততদিনই ক্ষমতায় থাকবেন ইমরান৷

সাক্ষাৎকারে ইমরানের সঙ্গে কাটানো বিভিন্ন মুহূর্তের কথাও তুলে ধরেছেন রেহাম৷ তিনি বলেন, ইমরানকে নিয়ে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম যতই লাফালাফি করুক, তাদের ফল ভুগতে হবেই৷ কারণ, ভোটের সময় পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফের অন্যতম স্লোগান ছিল- ‘ব্যাট চালাও ভারত ভাগাও’৷ কে না জানে দলটার প্রতীক চিহ্ন হলো ক্রিকেট ব্যাট৷

রেহাম খান যেভাবে পাক সেনার সঙ্গে ইমরান খানের দোস্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন, তাতে সরকারের ওপর সেনার কর্তৃত্ব ফের স্পষ্ট হয়ে গেছে৷ যদিও এই পাক বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মহিলা সরাসরি পাক রাজনীতিতে আসার প্রসঙ্গ উড়িয়ে দিয়েছেন৷ তাঁর দাবি, সেখানে কেউ আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করবে না৷

ইমরান ও রেহাম বিয়ে করেছিলেন৷ সেটা ছিল তাঁদের দু’জনেরই দ্বিতীয় সংসার জীবন৷ স্বল্পকালীন সেই বিবাহিত জীবন ভেঙে যায় এবং পাকিস্তানের এই জাতীয় নির্বাচনের ক’মাস আগে ইমরান এক ইসলামিক আধ্যাত্মিক মহিলা বুশরা মানেকাকে বিয়ে করেছেন৷

এদিকে পাক নির্বাচন কমিশন গত ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের চূড়ান্ত তালিকায় জানিয়েছে ১১৫টি আসন পেয়েছেন তেহরিক ই ইনসাফ৷ যে সব প্রার্থী একাধিক আসনে জয়ী হয়েছেন, তারা একটি আসন রেখে বাকিগুলো অবিলম্বে ছেড়ে দিন৷ পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়েছিলেন ইমরান খান৷ জিতেছেন পাঁচটিতেই। এখন তাঁকে ছাড়তে হবে বাকি চারটি আসন৷

সেই অর্থে পুনরায় ভোট না হওয়া পর্যন্ত পিটিআইয়ের আসন সংখ্যা কমে যাচ্ছে৷ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ২৭২ টি আসনের মধ্যে ১১৫ আসন পেয়ে ইমরানের পিটিআই বৃহত্তম দল হিসাবে আবির্ভূত হলেও, সরকার গড়তে পারছেন না তিনি। এ জন্য প্রয়োজন ১৩৭টি আসন। কিন্তু তা না থাকায় এখন জোট সরকার গড়তে মরিয়া ইমরান খান৷ আর বিরোধীরা নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে, ফের ভোটের দাবি করছেন৷ সূত্র: দ্য হিন্দু, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, জি নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email