বাঙালিনিউজ
ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূর ও জিএস গোলাম রাব্বানি

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ ২৮ বছর পর গতকাল ১১ মার্চ ২০১৯ সোমবার স্বাধীনতা পররর্তী অষ্টম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এবারের এই ে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সমাজসেবা সম্পাদক ছাড়া সব পদে জয়লাভ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ২৫টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সহ ২৩টি পদে ছাত্রলীগ প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। আর ডাকসুর ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক, এই দুটি পদে জয়লাভ করেছেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থীরা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বামজোটের সমর্থক প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও স্বতন্ত্র প্যানেল-সহ অন্যান্য প্যানেলের প্রার্থী বা স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থীই কোনো পদে জিততে পারেননি।

ডাকসুর ভিপি পদে জয়লাভ করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা হিসেবে পরিচিত ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’র প্রার্থী নুরুল হক নূর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন।

ঘোষিত ফল অনুযায়ী নুরুল হক নুর ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়েছেন। আর শোভন পেয়েছেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট। অর্থাৎ প্রায় দু’হাজার ভোটের ব্যবধানে শোভনকে হারিয়েছেন নুরুল হক নুর।

রাত সাড়ে তিনটার দিকে সিনেট ভবনে ডাকসুর সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড: মো. আখতারুজ্জামান ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি যখন ভিপি পদে ফল ঘোষণা করেন, তখন সেখানে ছাত্রলীগ সভাপতি, ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনসহ অন্য ছাত্রলীগ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রলীগ কর্মীরা সিনেট ভবনে ‘মানিনা..মানিনা..ভুয়া..ভুয়া’ শ্লোগান দেন।

গতকাল ১১ মার্চ সোমবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের পাশাপাশি হল সংসদগুলোতেও ভোটগ্রহণ করা হয়। ছাত্রদের হল সংসদগুলোর নির্বাচনেও ছাত্রলীগ একচেটিয়া জয় পেয়েছে। তবে ছাত্রী হলগুলোকে জয়ী হয়েছে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ প্যানেল প্রার্থীরা।

তবে এবারই প্রথম সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) অধিকাংশ আসনে জয়লাভ করলো। অবশ্য ভিপি পদের ক্ষেত্রে আগের ধারাবাহিকতাই বজায় থাকলো।

এখানে স্মরণযোগ্য যে, স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম ছাত্র সংগঠনগুলোর প্যানেলের বাইরে থেকে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হলেন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছর ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’র ব্যানারে জোরাল আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পান এই ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক নূর। তারপর ‘হামলা, মামলা, নির্যাতন’ পেরিয়ে ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষার্থী এবার ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হলেন।

এদিকে, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানি এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন।

জিএস পদে ছাত্রলীগের রাব্বানি ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের রাশেদ খান পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৩ ভোট।

এজিএস পদে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ফারুক হোসেন। তিনি পেয়েছেন ৫ হাজার ৮৯৬ ভোট।

ডাকসুর অন্য পদগুলোতে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা হলেন, সাদ বিন কাদের চৌধুরী (স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক), মো. আরিফ ইবনে আলী (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি), লিপি আক্তার (কমনরুম ও ক্যাফেটারিয়া), শাহরিয়া তানজিন অর্নী (আন্তর্জাতিক সম্পাদক), মাজহারুল কবির শয়ন (সাহিত্য সম্পাদক), আসিফ তালুকদার (সংস্কৃতি সম্পাদক), শাকিল আহমেদ তানভীর (ক্রীড়া সম্পাদক), শামস-ঈ-নোমান (ছাত্র পরিবহন) ও আখতার হোসেন (সমাজসেবা সম্পাদক)।

সদস্য পদে বিজয়ীরা হলেন- যোশীয় সাংমা চিবল, রকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য, তানভীর হাসান সৈকত, তিলোত্তমা সিকদার, নিপু ইসলাম তন্বি, রাইসা নাসের, সাবরিনা ইতি, রাকিবুল হাসান রাকিব, নজরুল ইসলাম, মোছা ফরিদা পারভীন, মুহা. মাহমুদুল হাসান, সাইফুল ইসলাম রাসেল ও রফিকুল ইসলাম সবুজ।

এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কিছু আগে ছাত্রদল, বাম জোট ও স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ প্যানেলও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ভোটারদের বাধা দেওয়া অভিযোগও তোলেন তারা।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে বেলা দেড়টার দিকে ছাত্রদল এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সম্মিলিতভাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রগতিশীল ছাত্রজোট, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্রমুক্তি জোট, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বতন্ত্র জোট ও স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। স্বতন্ত্র জোট তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেইজে ভোর্ট বর্জনের ঘোষণা দেয়।

এই নির্বাচন বাতিলের দাবিতে উপাচার্য ভবন ও কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভের পর ভোট বর্জনকারীদের পক্ষে আজ মঙ্গলবার বিক্ষোভের ডাক দেন বাম জোটের ভিপি প্রার্থী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী। বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র তুল ধরে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানান নিজস্ব উদ্যোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী আটজন শিক্ষকও।

অন্যদিকে ছাত্রলীগ নেতারা দাবি করেছেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং তাদের ঠেকাতে ছাত্রদলসহ অন্য প্যানেলগুলো পরিকল্পিতভাবে ‘নাটক’ সাজিয়েছে। বিচ্ছিন্ন দুই-একটি ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন হয়েছে বলে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান দাবি করেন।

Print Friendly, PDF & Email

Related posts