বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন করার জন্য ছয় মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়ার যে আদেশ হাই কোর্ট দিয়েছেন, তা স্থগিত চেয়ে আপিলের আবেদন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আজ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে গতকাল ১৬ সেপ্টেম্বর রোববার লিভ টু আপিলের আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

ছয় বছর আগের রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে চলতি বছর ১৭ জানুয়ারি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে হাই কোর্ট যে আদেশ দিয়েছিলেন, সেই রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

কিন্তু সাত মাসেও নির্বাচনের কোনও আয়োজন দৃশ্যমান না হওয়ায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিস পাঠান মনজিল মোরসেদ। কিন্তু নোটিশের জবাব না পেয়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর উপাচার্যসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন তিনি।

এ অবস্থায় গতকাল ১৬ সেপ্টেম্বর রোববার ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ক্রিয়াশীল’ ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। বৈঠকের পর উপাচার্য সাংবাদিকদের জানান, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে ডাকসুর নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়ে প্রশাসন কাজ করছে।

উপাচার্য বলেন, “ডাকসু নির্বাচনের কাজের যে লোড, যে কর্মপরিধি তা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের প্রভোস্ট কমিটি, শৃঙ্খলা পরিষদ ও সিন্ডিকেট একটা লক্ষ্য ইতোমধ্যে দিয়েছে, সেটা হল মার্চ ২০১৯। এই নিরিখে আমাদের ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। আশা করি অক্টোবরের মধ্যে খসড়া ভোটার তালিকা হয়ে যাবে। এই ভোটার তালিকা প্রণয়ন একটি জটিল কাজ। সেটি করতে পারলে অনেক এগিয়ে যাব।”

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মার্চ মাসের লক্ষ্যের কথা বললেও ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে সবচেয়ে সোচ্চার অবস্থানে থাকা বাম ছাত্র সংগঠনগুলো এ বছরের মধ্যেই নির্বাচন চেয়েছে।

অন্যদিকে ক্যাম্পাসের হলগুলোর কর্তৃত্বে থাকা ছাত্রলীগ এবং ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা ছাত্রদলের কাছ থেকে এসেছে একই রকম বক্তব্য। দুই দলই বলেছে যৌক্তিক সময়ে নির্বাচন করার কথা। তবে ছাত্রদলের দাবি, নির্বাচনে যাওয়ার আগে ক্যাম্পাসে সব সংগঠনের সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয় সংলগ্ন আব্দুল মতিন ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষে প্রায় চার ঘণ্টা এই বৈঠক চলে।

ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি ও শিক্ষক সমিতি নেতারা সভায় বক্তব্য দেন।

আলোচনা শেষে উপাচার্য লাউঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক কবি মুহম্মদ সামাদ, প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রাব্বানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন।

নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সব দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করার যে দাবি এসেছে, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উপাচার্য বলেন, “প্রভোস্টবৃন্দ এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। মধুর ক্যান্টিনকেন্দ্রিক যে রাজনৈতিক চর্চা, সেটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের যে কার্যক্রম চালাবে তাতে প্রশাসন থেকে কোনো বাধা নেই।”

দুই যুগ ধরে ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় প্রশাসনকে বাধ্য করতে ২০১২ সালে এই রিট আবেদন করেছিলেন ২৫ জন শিক্ষার্থী। আদালত তখন রুল দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ডাকসু নির্বাচন করার ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। সেই রুলের নিষ্পত্তি করেই ১৭ জানুয়ারি রায় দেন হাই কোর্ট।

রিট আবেদনে আদালতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরের বছর যাত্রা শুরু করে ডাকসু। প্রথমে পরোক্ষ নির্বাচন হলেও, শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে ডাকসু নির্বাচন শুরু হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর।

ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে ডাকসু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ ও ছাত্রনেতারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবছর ডাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভোট হয়েছে মাত্র ছয়বার। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর পর আর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও গত ২৮ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়নি।

Print Friendly, PDF & Email