বাঙালিনিউজ
আন্তর্জাতিকডেস্ক

চূড়ান্ত বিপর্যয়ের আর দেরি নেই। বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাবধান করছেন বিজ্ঞানীরা। টনক নড়েনি কারও। পরীক্ষার ফল বেরোতে দেখা যাচ্ছে, সর্বনাশের থেকে মাত্র বারো বছর দূরে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবী!

জলবায়ু বিপর্যয় রোধে ‘চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বিশ্ব। এত দিন ধরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, তাপমাত্রা অন্তত ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘ প্যানেলের তৈরি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে সমাজের সব স্তরে অবশ্যই ‘দ্রুত, সুদূরপ্রসারী ও নজিরবিহীন ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে বিশ্বকে।’

২০১৫তে প্যারিস চুক্তি সইয়ের আগে পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়া পর্যন্ত পৃথিবী নিরাপদ। কিন্তু আইপিসিসি-র রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সামগ্রিক ভাবে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা এখনই গত ১৫০ বছরের তুলনায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এবং তাতেই যা অবস্থা, সেটা সমুদ্রতল বিপদসীমা ছাড়ানোর জন্য যথেষ্ট। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই বেঁধে রাখতে হবে। কিন্তু এখন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা যে হারে বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতেই তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে।

জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু প্যানেল (আইপিসিসি) দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই ঝুঁকির কথা জানায়। তিন বছর ধরে গবেষণার পর তৈরি এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা পার করে ফেলবে। ফলে তীব্র খরা, দাবানল, বন্যা ও চরম খাদ্যঘাটতির মধ্যে পড়বে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। আজ যারা পৃথিবীতে বাস করছে তাদের অনেকে জীবদ্দশাতেই এসব সংকট দেখে যাবে; যার প্রধানতম কারণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ।

এখন তাপমাত্রার বৃদ্ধি যদি ১.৫ ডিগ্রিতে বেঁধে রাখতে হয়, তা হলে ২০৫০ সালের মধ্যে গোটা পৃথিবীকে ‘কার্বন নিরপেক্ষ’ হতে হবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট রিসার্চ প্রোগ্রাম-এর প্রধান এবং আইপিসিসি রিপোর্টের মূল লেখক মাইলস অ্যালেন বললেন, ‘কার্বন নিরপেক্ষ’ হওয়া মানে প্রকৃতি থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ ও ত্যাগের মধ্যে একটা সমতা রাখা। সেটা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর আনুমানিক ২ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি ডলার শক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে, যা কিনা বিশ্বের জিডিপি-র ২.৫ শতাংশ। গ্রিন হাউস গ্যাস তৈরি অবশ্যই কমাতে হবে। কমাতে হবে গ্যাজেটের ব্যবহার। সেই সঙ্গে জোর দিতে হবে ‘জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ে।

পরিস্থিতিতে রাশ টানতে হলে বড়সড় বদল আনতে হবে জীবনযাপন থেকে শুরু করে কৃষি-শিল্প-শক্তিনীতিতে, বার্তা রাষ্ট্রপুঞ্জের বিজ্ঞানীদের। হাতে সময় আছে মাত্র ১২টা বছর। না হলে ২০৩০ সালের মধ্যেই ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে আরও ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাতে ক্রান্তীয় অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়বে। যা ডেকে আনবে প্লাবন। বিপন্ন হবে বদ্বীপ এবং দ্বীপরাষ্ট্রগুলি। পরপর ঝড় আছড়ে পড়বে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।

কি পদ্ধতি নেয়া যায়? বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে তা থেকে জ্বালানি প্রস্তুত করা বা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া। এই পদ্ধতিটি যদিও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণও একটা উপায়। বাঁচাতে হবে জঙ্গল। জৈবজ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আখ, গম, ভুট্টার মতো ‘বায়োফুয়েল’ চাষ বাড়ালে উপকার হবে। আইপিসিসি-র কো-চেয়ার এবং লন্ডনে ‘সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল পলিসি’র অধ্যাপক জিম স্কেয়া-র কথায়, ‘‘আমরা আমাদের কাজ করেছি। বাকিটা সরকারের দায়িত্ব।’’

শিল্পায়ন শুরুর পর থেকে তাপমাত্রা এর মধ্যে বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগামী কয়েক বছরে আরো বৃদ্ধি এড়াতে চাইলে অবশ্যই জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক বিবৃতিতে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের জলবায়ুবিজ্ঞান বিষয়ক প্রভাষক অ্যান্ড্রু কিং বলেন,  ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করলে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেবে। এর মধ্যে রয়েছে আরো দাবদাহ, উষ্ণতর গ্রীষ্ম, সমুদ্রস্তরের স্ফীতি এবং বিশ্বের বহু জায়গায় তীব্র খরা ও বৃষ্টিপাত।’ তাপমাত্রার বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে ২০১০ সালের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো এবং ২০৫০ সালের মধ্যে একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার কথা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কার্বন নিঃসরণ খাতা-কলমে এই পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। তবে সে ক্ষেত্রে জ্বালানি, শিল্প, ভবন, পরিবহন ও শহরগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে’; যা কঠিন হলেও এখনো সম্ভব। ‘তবে তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনার সুযোগগুলো দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।’ নাসার পাখির চোখে দেখা অপারেশন আইসব্রিজ গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভুক্তভোগী আর্কটিক অঞ্চল।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তন এরই মধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করা না গেলে সামনে যা আসছে তা আরো ভয়াবহ হবে। আগামী এক দশকের মধ্যে শুধু ইউরোপেরই তাপমাত্রা বাড়বে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে এ বছর যেমন খরা হলো তেমন তীব্র খরা বাড়বে। বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানা হারিকেন হার্ভি ও ফ্লোরেন্সের মতো ঝড়গুলোও। প্রবালপ্রাচীর শুকিয়ে আসবে ৭০% থেকে ৯০% পর্যন্ত। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ হয়তো পুরোপুরি মরে যাবে। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো সবচেয়ে বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে পড়বে। পরিবর্তনগুলো হবে দীর্ঘস্থায়ী অথবা অপরিবর্তনীয়। কিছু বাস্তুতন্ত্র একেবারে হারিয়ে যাবে। ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রস্তরের বৃদ্ধি ঘটবে ১০ সেন্টিমিটার।

তবে এর মধ্যেও আশা ছাড়তে রাজি নন বিজ্ঞানীরা। ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণা কেন্দ্রের ফেলো সারাহ পারকিন্স-কিরকপ্যাট্রিক বলেন, ‘নিঃসরণ কমাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অপরিহার্য। এর জন্য আগামী কয়েকটি বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ সূত্র : বিবিসি,সিএনএন।