বাঙালিনিউজ
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন কবি আল মাহমুদ

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ক‌বি আল মাহমু‌দ আর নেই। রাজধানী ঢাকার ধানমণ্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতা‌লে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। কবির ব্যক্তিগত সহকারী আবিদ আজম মিডিয়াকে এই খবর নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কবিকে ধানমণ্ডির এই ইবনে সিনা হাসপাতা‌লে নেওয়া হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের এ সময়ের অন্যতম কবি আল মাহমুদকে। প্রথমে সিসিইউ ও পরে আইসিইউতে রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

কবির ব্যক্তিগত সহকারী আবিদ আজম জানান, শুক্রবার রাত ১০ দিকে আল মাহমুদকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। তিনি নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

ড. আব্দুল হাই জানান, কবির নিউমোনিয়া বৃহস্পতিবার থেকে বেড়ে গিয়েছিল। শুক্রবার সকাল থেকে নতুন করে প্রেসার কমে যেতে শুরু করে। তবে ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এরপর রাতে হঠাৎ করে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তখন হার্ট বিট বন্ধ হয়ে যায়। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে প্রেসার মেইনটেন হয় না। তখন ব্রেইন, কিডনি অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হলে মানুষ ক্লিনিক্যালি মারা যায়। তারও সেটাই হয়েছে।

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মাহমুদ। তার প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তার পিতার নাম মীর আবদুর রব ও মাতার নাম রওশন আরা মীর। তার দাদা আবদুল ওহাব মোল্লা হবিগঞ্জে জমিদার ছিলেন।

বাঙালিনিউজ

কবি আল মাহমুদ কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে পড়ালেখা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা শুরু করেন এবং একের পর এক সাফল্য লাভ করেন।

সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে মাহমুদ ঢাকায় আসেন। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে কবি আল মাহমুদ সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

আল মাহমুদ ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।

সাহিত্যে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার, ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই কবি।

লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৬৬), মায়াবি পর্দা দুলে ওঠে, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, বখতিয়ারের ঘোড়া, একচক্ষু হরিণ, দোয়েল ও দয়িতা, দ্বিতীয় ভাঙ্গন, নদীর ভিতরে নদী, না কোনো শূন্যতা মানি না, বিরামপুরের যাত্রী, বারুদগন্ধি মানুষের দেশ, সেলাই করা মুখ, তোমার রক্তে তোমার গন্ধ ইত্যাদি আল মাহমুদের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তার কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে স্থান করে দেয়।

বাঙালিনিউজ

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সাহিত্য চর্চায় সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিক, চেতনা ও বাকশৈলীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি আল মাহমুদ। তবে তিনি একইসঙ্গে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক।

কবির সাড়া জাগানো উপন্যাস কাবিলের বোন, পানকৌড়ির রক্ত, উপমহাদেশ, ডাহুকি, যেভাবে বেড়ে উঠি, আগুনের মেয়ে, যমুনাবতী, চেহারার চতুরঙ্গ, যে পারো ভুলিয়ে দাও, ধীরে খাও অজগরী ইত্যাদি।

কবির মৃত্যু সংবাদ শুনে অনেকে হাসপাতালের লবিতে ভিড় করছেন। একে একে হাসপাতালে এসে জড়ো হতে থাকেন কবি, সাহিত্যিক-সহ গণমাধ্যম কর্মীরা।

ইবনে সিনা হাসপাতালের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার(এডমিন) আনিসুজ্জামান কবির মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে বলেন, কবি আল মাহমুদ বেশ কিছু জটিল রোগ নিয়ে ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রফেসর আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ টিম গঠন করে আমরা তার চিকিৎসা করে এসেছি। কিন্তু শুরুর দিন থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। সর্বশেষ আজকে রাত ১১টা ৫ মিনিটে হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে যান। তারপরই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কবি আল মাহমুদের দাফনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবার থেকে নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আনিসুজ্জামান বলেন, কবির পরিবারের অনেকের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। তারা এখানে উপস্থিত আছেন। অনেকেই মৃত্যু সংবাদ শুনে হাসপাতালে আসছেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কবিকে তারা কোথায় দাফন দিতে চান। আমার প্রশ্নের জবাবে তারা বলেছেন কবিকে তারা বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে চান।

Print Friendly, PDF & Email