বাঙালিনিউজ
সুদানের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক সপ্তাহ পরও দেশটিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি।

বাঙালিনিউজ
আন্তর্জাতিকডেস্ক

সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক সপ্তাহ পরও দেশটিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। গত ১১ এপ্রিল ২০১৯ বৃহস্পতিবার সুদানের টানা ৩০ বছরের শাসক ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বশিরের বিরুদ্ধে অব্যাহত গণবিক্ষোভের কারণে দেশটির সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেদের হাতে ক্ষমতা নেয়।

আর তাই বিক্ষোভকারীরা এবার নতুন সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। ফলে আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা এখনো অসমাপ্তই রয়ে গেছে। কারণ, তারা বেসামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর দাবি করছেন। তাদের আশঙ্কা রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে যে অর্জন হয়েছে তা ‘ছিনতাই’ হয়ে যেতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন সেনা কাউন্সিল বুধবার জানিয়েছে, বশির ও তার ভাইদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট উমর আল বশিরকে প্রেসিডেন্ট প্যালেসের গৃহবন্দি অবস্থা থেকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এমন ঘোষণাতেও বিক্ষোভকারীরা শান্ত হচ্ছেন না। সুদানের সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে শতাধিক চিকিৎসক মিছিল নিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেন।

সাংবাদিকরাও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিতে আলাদাভাবে সুদানের রাজধানী খার্তুমে মিছিল করেছে। বিক্ষোভকারীরা, স্বাধীনতা, শান্তি, ন্যায়বিচার ও জনগণের বিপ্লবের শ্লোগান দেন।

আয়া আব্দেল আজিজ নামে ২২ বছর বয়সী একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান। খালিদ মোহামেদ নামে আরেকজন চিকিৎসক এএফপিকে বলেন, বশির চলে গেছেন। কিন্তু আমরা এখনও তার শাসনামল থেকে মুক্তি পাইনি।

অন্তর্বর্তীকালীন বেসামরিক সরকারের হাতে এখনই ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে বশির বিরোধী বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেয়া সুদানিজ প্রফেসনালস অ্যাসোসিয়েশন (এসপিএ)। তাদের আশঙ্কা এখনও বশিরের নিয়োগ দেয়া সেনা কর্মকর্তারাই দায়িত্বে রয়েছেন। তাই তারই আশীর্বাদপুষ্ট কেউ ক্ষমতা দখল বা নির্বাচনের মাধ্যমে উত্তরাধিকারী হিসেবে আসতে পারে।

খার্তুমে বিক্ষোভরত ফাদিয়া খালাফ নামে একজন এএফপিকে বলেন, আমাদের উপর টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়েছে। অনেকে কারাগারে আছেন। গুলিতে অনেকে মারা গেছে। সবকিছু যে দাবির জন্য হয়েছে সেটা এখনই পূরণ করতে হবে। আমরা আশঙ্কা করছি বিপ্লব ছিনতাই হয়ে যেতে পারে। তাই আমরা বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছি। যতোক্ষণ না দাবি পূরণ হয় আমরা এখানেই থাকব।

সামরিক কাউন্সিল বলছে, তারা বিক্ষোভকারীদের দাবি অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনজন শীর্ষ পাবলিক প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে নতুন একজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একজন বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। তবে আমরা যে কোনো মূ্ল্যে দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখব।

বিক্ষোভকারীরা খার্তুমের মধ্যাঞ্চলের সেনা সদরদপ্তরের বাইরে একটানা অবস্থান নিয়ে অব্যাহত ভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে যায়। সেখানে সমবেত হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সুদানের সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট বশিরকে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে।

বশিরের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে তাকে রাজধানীর কোবের কারাগারে পাঠানো হয়। বশিরের উচ্ছেদের সাত দিন পূর্ণ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা এখন তার স্থালাভিষিক্ত হওয়া সামরিক পরিষদের অপসারণ চাইছে।

তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আওয়াদ ইবনে ওউফ পরিষদের প্রধান হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তবে জনতার চাপের মুখে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকেও উচ্ছেদ করা হয়। এখন পরিষদের প্রধান হিসেবে প্রবীণ সেনা কর্মকর্তা জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আল-বুরহানকে নিয়োগ করা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর লোক হলেও তিনি সেনাবাহিনীর বাইরের জগতেও ব্যাপকভাবে পরিচিত। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তারা একটি যৌথ সামরিক-বেসামরিক পরিষদ গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু গঠন করা হয়েছে সম্পূর্ণ সামরিক পরিষদ। এই পরিষদে বশির সরকারের অনেকেই আছেন।

সুদানিজ প্রফেশনালস অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ নাজি বলেন, ‘আমরা এই সামরিক পরিষদের বিলুপ্তি ঘটিয়ে এর স্থলে বেসামরিক পরিষদ চাই, যেখানে সামরিক প্রতিনিধিরাও থাকবেন। সামরিক বেসামরিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পরিষদ চাই আমরা।’ বিক্ষোভের আয়োজকরা বলেন, এই বেসামরিক পরিষদই চার বছরের বেসামরিক সরকারের জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করবে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক অ্যালেন বসওয়েল বলেন, ‘এটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই বিপ্লব এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’ বশির ও তার পরবর্তী উত্তরসূরি ইবনে ওউফের অপসারণের পর জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা (এনআইএসএস) এর প্রধান সালাহ গোস পদত্যাগ করেছেন। তিনি বিক্ষোভ দমনের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় ৬০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী প্রাণ হারায়, কয়েকশ আহত হয় এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে কারাগারে আটক করা হয়।

উদ্বুত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে সাথে নিয়ে একটি ‘ব্যাপক ও বিস্তারিত আলোচনার’ আহ্বান জানিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়েছে। গত সোমবার ৫৫ সদস্যরাষ্ট্র বিশিষ্ট আফ্রিকান ইউনিয়ন সামরিক বাহিনী ১৫ দিনের মধ্যে ক্ষমতা বেসামরিকদের হাতে হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হলে সুদানকে জোট থেকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষকে সমর্থন দিয়েছে। ২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দক্ষিণ সুদান সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

৭৫ বছর বয়সী বশির ১৯৮৯ সালে ইসলামপন্থীদের সমর্থনে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাবে তিন দশক দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলে দেশব্যাপী সংঘাত-সংঘর্ষ লেগেই থাকত। তার আমলেই দক্ষিণ সুদান বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটি এখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এছাড়া প্রেসিডেন্ট বশিরের শাসনামলে গ্রেফতার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিরোধী দলীয় নেতা, কর্মী ও সাংবাদিকদের প্রায়ই গ্রেফতার করা হতো।

গত বছর ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর রুটির দাম তিনগুণ বাড়ানোর প্রতিবাদে প্রথমে বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে এটি দ্রুত দেশব্যাপী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। শহর ও গ্রামগুলো স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা ‘মুক্তি, শান্তি, ন্যায়বিচার’, ‘শুধু সরকারের পতন চাই’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। বশির বিরোধীদের দীর্ঘ বিক্ষোভের পর সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়।

বশির ক্ষমতাচ্যুত হবার এক সপ্তাহ পর খার্তুমের প্রকৌশলী তারিক আহমেদ (২৮) বলেন, ‘বশিরের শাসন আমল ছাড়া এটিই আমার জীবনের প্রথম সপ্তাহ।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার প্রজন্ম এই স্বৈরশাসককে হটাতে পেরেছে বলে আমি গর্বিত।’

উল্লেখ্য, দারফুর সংঘাতের ঘটনায় বশিরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এজন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছে। তবে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ বলছে তারা বশিরকে কারো হাতে হস্তান্তর করবে না। দেশের মাটিতেই তার বিচার করবে। তাই বশিরকে আটকের পরও সেনাবাহিনী তাকে হেগে’র কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email