বাঙালিনিউজ
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত লেখিকা রমা চৌধুরী আর নেই। আজ ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার ভোর ৪টার দিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে তিনি মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
রমা চৌধুরীর মৃত্যুর খবর মিডিয়াকে নিশ্চিত করেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহচর ও তাঁর বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দীন খোকন। খোকন জানান, গতকাল ০২ সেপ্টেম্বর রোববার সন্ধ্যার দিকে দিদির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। রাতেই তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো চেষ্টায় কাজে আসেনি। আজ ভোর ৪টার দিকে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

১৯৩৬ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। বলা হয়ে থাকে তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জনকারী নারী।

রমা চৌধুরী ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর, ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।

চার ছেলে সাগর, টগর, জহর এবং দীপংকরকে নিয়ে ছিল রমার সংসার। কিন্তু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর হাতে দুই ছেলেকে হারান তিনি। পাশাপাশি নিজের সম্ভ্রমও হারান রমা চৌধুরী। পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁর ঘর-বাড়ি।

তবুও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি এই একাত্তরের বীরাঙ্গনা নারী। শুরু করেন নতুনভাবে পথচলা। গত ২০ বছর ধরে লেখালেখি করেছেন৷ লিখেছেন একে একে ১৮টি বই। এসব বই বিক্রি করেই চলত তাঁর সংসার। একাত্তরে ২ সন্তানকে হারানোর পর, রমা চৌধুরী পায়ে জুতা বা স্যান্ডেল পরতেন না৷ খালি পায়ে চলাফেরা করতেন৷

একাত্তরে সব হারানো এই নারী যেন পথেই ঠিকানা করে নিয়েছেন৷ খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে চট্টগ্রামের রাস্তায় বই ফেরি করে বিক্রি করতেন। আর ওই টাকায় জীবন চলত তাঁর৷ মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘‘একাত্তরের জননী”৷

রমা চৌধুরীর এই দুঃসহ জীবন এবং সংগ্রামের কথা সংবাদ মাধ্যম ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। সেই খবর নজরে আসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার৷ ২০১৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে রমা চৌধুরীকে গণভবনে ডেকে নিয়ে অন্তরঙ্গভাবে আলাপ করেন প্রধানমন্ত্রী। একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন তাঁরা।

তাঁরা একান্তে কথা বলার সময় তাঁদের জীবনের সংগ্রাম আর কষ্টের কথা আলোচনা করেন৷ দু’জনই সব হারিয়েছেন৷ একজন একাত্তরে, আরেকজন পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টে৷ ভাগ করে নিয়েছেন তাঁরা জীবনের বেদনার গল্প৷ প্রধানমন্ত্রী রমা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন সব হারানোর কষ্ট তিনি বোঝেন৷

এসময় রমা চৌধুরী তাঁর লেখা বই ‘‘একাত্তরের জননী’’ প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন৷ প্রধানমন্ত্রী রমা চৌধুরীর আত্মসম্মান দেখে মুগ্ধ হন৷ তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনও সহায়তা চাননি৷

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর রমা চৌধুরী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর প্রাণের ঠিকানা চট্টগ্রাম ফিরেন৷

রমা চৌধুরীর অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্ন ছিল৷ আর সেই স্বপ্ন তিনি পুরণ করতে চেয়েছিলেন ফেরি করে বই বিক্রির টাকায়৷ রমা চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তাঁর নিজের কোনও চাওয়া পাওয়া নেই৷ সবাই মিলে যদি দেশটাকে গড়া যায়, তাহলে তিনি খুশী হবেন৷ বিলাসিতা-উপভোগ বাদ দিয়ে সবাই মিলে দেশটাকে গড়ার কথা বলেছিলেন তিনি৷

কোমরের আঘাত, গলব্লাডার স্টোন, ডায়াবেটিস, অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি রমা চৌধুরী ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

রমা চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল বাঙালির মনে। তাঁর জন্য শোক প্রকাশ করেছেন জাতির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সর্বস্তরের মানুষ।

Print Friendly, PDF & Email