বাঙালিনিউজ

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ০৮ মার্চ ২০১৯ শুক্রবার, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হচ্ছে যথাযথ মর্যাদায়, নানা আনুষ্ঠানিকতায়। ১৯৭৫ সাল থেকে প্রতি বছর সারা বিশ্বে এই দিনটি হিসেবে পালিত হয়। ‘সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো, নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পালিত হচ্ছে এবারের নারী দিবস।

দিবসটি উপলক্ষে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মহিলা এবং শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ মানবাধিকার ও নারী সংগঠনগুলো দিবসটি উদযাপনে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল ৯ মার্চ শনিবার সকাল ৯ টার সময় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ৫ জন জয়িতাকে পুরষ্কৃত করা হবে।

এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে, নারীদের ওপর বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, নারীদের সচেতন ও জাগ্রত করা। নারী দিবসের রঙ নির্ধারিত হয়েছে বেগুনি এবং সাদা, যা নারীর প্রতীক। বেগুনি রঙ নির্দেশ করে সুবিচার ও মর্যাদা, যা দৃঢ়ভাবে নারীর সমতায়ন। আর সাদা শান্তির প্রতীক।

১৯৮৩ সালে পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখক এবং নারীবাদী অ্যালিস ওয়াকারের প্রশংসিত উপন্যাস ‘দ্য কালার পারপল’ বইটি এই রঙ নির্ধারণে অনুপ্রেরণা জোগায়। এ বইতে তিনি নারীদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। ধারণা করা হয়, সেখান থেকেই নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গেছে বেগুনি-সাদা রঙ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৫৭ সালে নিজেদের অধিকার ও দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে নামা নিউইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের আন্দোলন ও তাদের ওপর ওই বছর ০৮ মার্চ নির্যাতনের দিনটি স্মরণে এই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা হয়।

১৮৫৭ সালের ০৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারীশ্রমিকরা সড়কে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। কারখানায় বিপজ্জনক ও অমানবিক কর্মপরিবেশ, স্বল্প মজুরি এবং দৈনিক ১২ ঘণ্টা শ্রমের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করেন। তারা বেতন বৈষম্য দূর করা, নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা এবং কাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য নারী শ্রমিকরা ওইদিন একজোট হয়ে রাজপথে নামলে, তাদের উপর কারখানা মালিকরা এবং তাদের মদদপুষ্ট প্রশাসন দমন-পীড়ন চালায়।

প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ১৯০৮ সালে জার্মানিতে এ দিনটি স্মরণে প্রথম নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালের ০৮ মার্চ ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে প্রায় ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছিলেন।

এ সম্মেলনেই জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এবং ‘নারী অধিকার’ আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রতি বছরের ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রথম প্রস্তাব দেন। এরপর ১৯১১ সালে তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস সংগঠিত করেন। এরপর তাকে অনুসরণ করে ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সাল থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে।

১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়। এর দুই বছর পর ১৯৭৭ সালে দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে আজ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, আলোচনাসভা, মানববন্ধন এবং নারী সমাবেশ।

এদিকে গতকাল ০৭ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এক সমাবেশের আয়োজন করে ‘আমরাই পারি’ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট। ৮ মার্চ প্রথম প্রহর ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে আমাদের আঁধার ভাঙার এ শপথে সকলের সংহতি প্রত্যাশা করে সংগঠনটি।

আজ ৬৭টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি বেলা আড়াইটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ৫৮টি জেলা শহরে সহযোগী সংগঠন ও নারী সংগঠনসমূহের নেটওয়ার্ক ‘দুর্বার’ এর মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে নারীপক্ষ। তাদের এবারের প্রতিপাদ্য ‘নারীর নাগরিক অধিকার।’

আজ সকাল সাড়ে ৯টায় নারীপক্ষ কার্যালয়ের সামনে থেকে রোডশো শুরু হয়ে সকাল ১০টায় মানিক মিয়া এভিনিউতে গিয়ে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে রোডশো কালসী পর্যন্ত গিয়ে ফের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে এবং রোডশোটি আশুলিয়ায় গিয়ে আরও একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি সমাপ্ত করবে।

এছাড়া জাতীয় প্রেসক্লাবে বিকাল ৫টায় এক সাংবাদিক সম্মাননা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সকাল ১০টায় শোভাযাত্রা ও বিকাল ৩টায় আলোচনা সভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে ড্যান কেক এক কনসার্টের আয়োজন করেছে। বিকাল ৪টায় রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠিত হবে এই কনসার্ট।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দিবসটি উপলক্ষে আজ এবং আগামীকাল দেশের সব জেলা শহরে নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শনী, মেলা এবং জনসচেতনতামূলক ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হবে। কর্মসূচিতে সরকারি ও বেসরকারি সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন। দিবসটির প্রতিপাদ্য তুলে ধরে প্রদর্শন করা হবে বিল বোর্ড, ফেস্টুন ও পোস্টার। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে।

নারী আন্দোলনের নেত্রীরা বলছেন, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত যে নারীরা খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, হামলা ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, তাদের জন্য নারী দিবস কোনও বার্তা বয়ে আনতে পারছে না। এদেশে এখনও অনেক জায়গায় জন্মের আগেই কন্যাশিশুর ভ্রূণ হত্যা করা হয়। মেয়ে জন্ম দেওয়ার ‘অপরাধে’ মাকে তালাক দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এমনকী কন্যাশিশুকে মেরে ফেলাও হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

গুগল ডুডলে আন্তর্জাতিক নারী দিবস

গুগল ডুডল

এদিকে, আজ ০৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী উদযাপনের লক্ষে গুগল তাদের হোম পেজে বিশেষ ডুডল প্রদর্শন করছে। এই বিশেষ ডুডলটি তৈরি করেছেন নারীরা। এখানে স্লাইড শোর মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গনের সফল নারীদের মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। হোম পাতায় বিভিন্ন ভাষায় নারী কথাটি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে শুরুতেই স্থান পেয়েছে বাংলা ভাষায় লেখা ‘নারী’ শব্দটি।

গুগল তাদের ডুডল পেজে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৯–এর শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছে, আজকের এ ইন্টারঅ্যাকটিভ ডুডলটি নারীদের নিয়ে নারীদের হাতে তৈরি। এতে বিভিন্ন ভাষায় ১৩ জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নারীর প্রেরণামূলক বক্তব্য স্থান পেয়েছে। এ ডুডলের থিম হচ্ছে ‘নারীর ক্ষমতায়নে নারী’।

গুগল জানিয়েছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই আজকের ডুডলটি প্রদর্শিত হচ্ছে।

বিভিন্ন দিবস, ব্যক্তি ও ঘটনার স্মরণে গুগল তাদের হোম পেজে বিশেষ লোগো ফুটিয়ে তোলে, যা ডুডল হিসেবে পরিচিত। এর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন দিবস ও ব্যক্তির স্মরণে এ ধরনের ডুডল প্রকাশ করে গুগল।

Print Friendly, PDF & Email

Related posts