বাঙালিনিউজ
সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: বাসস

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাঙালি জাতির মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আজ ২৬ মার্চ ভোর থেকে স্মরণ করছে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি। সর্বস্তরের জনতার পুষ্পাঞ্জলিতে ভরে উঠেছে ঢাকার সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ সহ একাত্তরের শহীদদের স্মরণে নির্মিত সকল স্মৃতিসৌধ। সব স্মৃতিস্তম্ভ বাঙালির শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে উঠছে। এর আগে ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে ঢাকায় দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

আজ ২৬ মার্চ ২০১৯ মঙ্গলবার, ৪৯তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে ভোর ৬টায়, জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে জাতির বীর সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ সময় তিন বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল এ সময় রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়, বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তার দল আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে ফের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধ এলাকা ছেড়ে গেলে, জাতীয় স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ, মেয়র সাঈদ খোকন, আতিকুল ইসলাম, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং বিদেশি কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের জনতা।

আজ ২৬ মার্চ ৪৯তম স্বাধীনতা দিবসে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করে জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে। বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে সেই ভিড়। স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নামে।

লাল-সবুজের শাড়ি কিংবা পাঞ্জাবি পাজামা পরে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তরুণ-তরুণী, প্রবীণদের পাশাপাশি অনেক শিশুকেও দেখা যায় অভিভাবকের আঙুল ধরে বা কাঁধে চড়ে স্মৃতিসৌধে আসতে। ঘণ্টা না পেরোতেই পুষ্পাঞ্চলিতে ভরে যায় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ।

সকাল ৭টা পর্যন্ত স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারবর্গ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা পুলিশ, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, জাবি কর্মকর্তা সমিতি ও বিভিন্ন হল এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জেএসডি), রাজউক, জাতীয় পার্টি, শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মহিলা ক্লাব, সিআরপি, সিডাব ও বিকল্প ধারা বাংলাদেশ প্রভৃতি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

এদিকে, সাভার স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে আসেন। সেখানে তিনি স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর পর প্রধানমন্ত্রী পৌঁছান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এবং একই সময় সারাদেশে একযোগে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের এই শিশু-কিশোর সমাবেশে ১০-১৮ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত শুদ্ধসুরে জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ এবং স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন সরকারপ্রধান, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

১৯৭১ সালের এই দিনে (২৬ মার্চ) পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর দমন অভিযানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি জাতি।

তার আগে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের ওপর দমন অভিযান শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালিও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে পরবর্তী দিক নির্দেশনা দেন। তাঁর সেই নির্দেশনায় বাঙালি স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত লড়াই ও মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তাল হয়ে ওঠে স্বাধীনতাকামী জনতা।

বাঙালির এই স্বাধীনতার আন্দোলন স্তব্ধ করার জন্য ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ-নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বেসামরিক লোকজনের ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বর্বর গণহত্যা শুরু করে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা এই হামলা চালায়। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ বাংলার (পূর্ব পাকিস্তানের) প্রগতিশীল সকল রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং সকল সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করে স্বাধীনতাকামীদের নিশ্চিহ্ন করা।

এই গণহত্যা শুরুর পরপরই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, প্রাণের মানুষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি যে কোনো মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এবং শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে দেশকে শত্রুমুক্ত করার আহ্বান জানান। মুহূর্তের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর পর পরই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে।

বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার পর, সারা দেশে তাঁর ঘোষণাপত্র ছড়িয়ে পড়ে। সাইক্লোস্টাইল করে স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে জনগণের মধ্যে প্রচার করা হয়। চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নানসহ স্থানীয় নেতারা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্প্রচার করেন। পরে ২৭ মার্চ মেজর জিয়া সহ আওয়ামী লীগ নেতারা আবারো বঙ্গবন্ধুর নামে ও তাঁর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন।

তারপর বাঙালি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ও আদেশ অনুযায়ী, তাঁর আদর্শ, চেতনা ও প্রেরণাকে হৃদয়ে ধারণ করে এবং তাঁর স্বাধীনতার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে প্রাণের ধ্রুবতারা করে লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনে। বাঙালি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে টানা ৯ মাস সশস্ত্র লড়াই করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তগঙ্গা ও ২ লাখ মা-বোনের অশ্রুসাগর পেরিয়ে অপরিমেয় ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বমানচিত্রে।

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দুই দিনব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ ভোরে বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৬ টায় সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ও সকাল ১০টায় টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।

এছাড়াও আগামী ২৭ মার্চ বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।

Print Friendly, PDF & Email