বাঙালিনিউজ

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ, ঢাকা

আজ ১৯ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার, বিজয়া দশমী। বাঙালি ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ের শেষ দিন। পাঁচ দিনের এই শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হবে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। মর্ত্যলোক ছেড়ে বিদায় নেবেন মা। অশ্রুসজল চোখে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিসর্জন দেবেন প্রতিমা। শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবী দুর্গার আবাহন হয়েছিল। আজ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটবে।

এখন বিদায়ের সুর মণ্ডপে মণ্ডপে। দোলায় চড়ে আজ মর্ত্য ছাড়বেন দুর্গতিনাশিনী উমা। ফিরবেন কৈলাশে। বিশ্বাস মতে, বোধনে ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি নিয়ে আনন্দময়ী মা উমাদেবীর আগমন ঘটে। টানা পাঁচদিন মৃন্ময়ীরূপে মণ্ডপে মণ্ডপে থেকে আজ ফিরে যাবেন কৈলাশে স্বামী শিবের সান্নিধ্যে।’ দূর কৈলাশ ছেড়ে মা পিতৃগৃহে আসেন নৌকায় চড়ে। আজ বিজয়া দশমীতে বিদায় নেবেন আবারো ঘোটকে।

তাই আজ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সত্য, সুন্দর, শুভ শক্তির জয় ও মানবজাতির কল্যাণ কামনা করে এবং সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরন্তর শান্তি ও সমপ্রীতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে সমাপন ঘটবে সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার।

প্রতিমা বিসর্জনের কারণে সব পূজামণ্ডপেই এখন বিষাদের সুর। মাকে বিদায় জানাতে হবে, তাই আজ সবার মন খারাপ। এর মধ্যেই চলছে মা দুর্গার বিদায়ের আয়োজন। চলছে শেষ বারের মতো ঢাক-কাঁসরের বাদ্যি-বাজনা, রাত্রি উজ্জ্বল করা আরতি ও পূজা-অর্চনা। আজ হিন্দুদের অনেকে উপবাসও করছেন।

একদিকে বিদায়ের সুর, অন্যদিকে উৎসবের আমেজ। ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, তাঁতী বাজার, শাঁখারী বাজার, স্বামীবাগসহ বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে আবির উৎসব। দেওয়া হচ্ছে দর্পণ ঘট বিসর্জন।

বাঙালিনিউজ

আজ সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দশমীবিহিত পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর সারাদেশে স্থানীয় আয়োজন ও সুবিধামতো সময়ে বিজয়ার শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রতিমা বিসর্জনের পর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করবেন।

রাজধানী ঢাকায় প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গন থেকে কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা বের হবে আজ বিকেল ৪টায়। এর আগে রাজধানীর ২৩৪টি পূজামণ্ডপের অধিকাংশই এসে জমা হবে পলাশীর মোড়ে। সেখান থেকে সম্মিলিত বাদ্যি-বাজনা, মন্ত্রোচ্চারণ ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হবে বিজয়ার শোভাযাত্রা। এর পর সদরঘাটের ওয়াইজঘাটের বুড়িগঙ্গা নদীর জলে একে একে বিসর্জন দেওয়া হবে প্রতিমা।

উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশনগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা ও নিবন্ধ। শারদীয় দুর্গোৎসব ও উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপে আজ দুপুর ১২টায় শুরু হয়েছে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। মণ্ডপে মণ্ডপে আজ চলছে শেষ বারের মতো পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, ভোগ-আরতিসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালা। এ ছাড়া দেশজুড়ে দুর্গোৎসব চলাকালে আলোকসজ্জা, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

গতকাল ছিল শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী। মা দেবী দুর্গাকে বিদায়ের আয়োজনে বিষণ্ণ মন নিয়েই উৎসবে মেতেছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। দিনটির প্রধান আকর্ষণ ছিল মণ্ডপে মণ্ডপে আরতি প্রতিযোগিতা। সন্ধ্যা ও রাত উজ্জ্বল করে ভক্তরা মেতেছিলেন নানা ঢঙে, আরতি নিবেদনে। সেইসঙ্গে ছিল দিনভর পুরোহিতদের চণ্ডীপাঠ। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের কীর্তন-বন্দনা। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও মহানবমীবিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা শেষে যথারীতি পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও সন্ধ্যায় ভোগ-আরতি করা হয়।

বাঙালিনিউজ

মহানবমীর দিনও আগের দিনের মতো রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলোতে মানুষের ঢল নেমেছিল। হাজার হাজার ভক্ত, পূজারি ও দর্শনার্থী মণ্ডপগুলোতে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দর্শন করেন। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথাও কোথাও মণ্ডপসংলগ্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় বিকেল থেকেই। এ কারণে নগরীর বিভিন্ন স্থানে যানজটের সৃষ্টি হয়। রাতে যানজট অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে যাওয়ায় পূজারিদের পড়তে হয় ভোগান্তির মধ্যে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন।

দেবী দুর্গা অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। এ বিজয় অর্জিত হয় আদ্যাশক্তি মহামায়ার সক্রিয় ভূমিকায়। মাতৃরূপিণী মহাশক্তি দুর্গা অশুভ শক্তির কবল থেকে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও ভক্তকুলকে রক্ষা করেন। এই অমিত চেতনার সঙ্গে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি যুক্ত হয়ে দেবী দুর্গাকে বাঙালি হিন্দু সমাজ ‘ঘরের মেয়ে’ হিসেবেই বরণ করে নেয়।

দুর্গাপূজার শুরু হয় মহালয়ায়। এদিন দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এর ঠিক পাঁচদিন পর মহাষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভ, সপ্তমীবিহিত পূজা। কদলীবৃক্ষসহ আটটি উদ্ভিদ এবং জোড়াবেল একসঙ্গে বেঁধে শাড়ি পরিয়ে একটি বধূ আকৃতিবিশিষ্ট করে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়। এই হল ‘নবপত্রিকা’, প্রচলিত ভাষায় যাকে ‘কলাবউ’ বলা হয়।

মহাষ্টমীতে হয় মহাষ্টম্যাদিকল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমীকল্পারম্ভ, মহাষ্টমীবিহিত পূজা, বীরাষ্টমীব্রত, মহাষ্টমী ব্রতোপবাস, কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা, মহাপূজা ও মহোৎসবযাত্রা, সন্ধিপূজা ও বলিদান। মহানবমীতে হয় কেবল মহানবমীকল্পারম্ভ, মহানবমী বিহিত পূজা। বিজয়া দশমীতে বিহিত বিসর্জনাঙ্গ পূজা, বিসর্জন, বিজয়া দশমী কৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা পূজা। এই দশমী তিথি বিজয়া দশমী নামে খ্যাত।

বাঙালিনিউজ

শারদীয় দুর্গোৎসবকে অকাল বোধন বলা হয়। অর্থাৎ অকালে দেবী দুর্গাকে জাগানো হয়। হিন্দু শাস্ত্রমতে সমস্ত বছরকে উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ন এই দুটি কালে ভাগ করা হয়। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত উত্তরায়ণ এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত সময়কে দক্ষিণায়ন কাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উত্তরায়ণ কালে দেবদেবীগণের জাগ্রত কাল এবং দক্ষিণায়ন দেবদেবীর নিদ্রাকাল। রামচন্দ্র যুদ্ধের প্রয়োজনে অকালে দেবীকে বোধন অর্থাৎ স্তব-স্তুতির মাধ্যমে জাগরণ ঘটিয়ে দুর্গাপূজো করেছিলেন। এ কারণে শারদীয় দুর্গাপূজাকে অকালবোধন বলা হয়। দেখা যায় দেবীকে নিদ্রা থেকে জাগানোর জন্য বেলতলায় মহাদেবের স্তবকরে অনুমতি নিয়ে বোধন ঘটাতে হয়।

দুর্গার নাম প্রথম পাই বৌধায়ন এবং সাংখ্যায়নের সূত্রে। আমাদের মহাকাব্যগুলোতে ইতস্তত দেবী, শক্তি ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু দশভুজা যুদ্ধরতা দেবীর বিশেষ কোনও খবর সেখানে নেই। মহাভারতের ভীষ্মপর্বে আছে, অর্জুন দুর্গার পূজা করছেন। স্কন্দ-কার্তিকের মহিষাসুর নিধনের কথাও আছে। কয়েকটি পুরাণে দুর্গার উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু হিন্দু দেবদেবীদের মধ্যে তিনি যথার্থ গুরুত্বের আসনে নেই।

দুর্গা সম্পর্কে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় গুপ্তযুগের পরে। বাংলায় আর একটু পর থেকেই দেবীর নানান রূপ সম্পর্কে লেখা ও ভাস্কর্য আসতে শুরু করে, কিন্তু আজকের এই প্রতিমার রূপটিতে পৌঁছতে আরও কয়েক শতাব্দী লেগে গিয়েছিল। পঞ্চদশ শতকে কৃত্তিবাসী রামায়ণে যুদ্ধরতা দেবী এবং রামচন্দ্রের অকালবোধন সম্পর্কে প্রচলিত নানান লোককাহিনিকে প্রথম একসূত্রে গাঁথা হলো, তৈরি হলো তার প্রথম নির্দিষ্ট বিবরণ, যাকে বাঙালির মা দুর্গা বলা যায়।

শ্রীরামচন্দ্রের অকালবোধনই আজ শারদীয় দুর্গোৎসব। সেদিন রামচন্দ্র অশুভের প্রতীক রাবণ-বধের জন্য দেবী দুর্গাকে আবাহন করেছিলেন। সে কারণেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মনের ভেতর ও বাইরের অসুর-বধের আশায় মায়ের কৃপা প্রার্থনা করেন। বর্তমান পৃথিবীতে বিদ্যমান অস্থিরতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানির মতো অশুভ তৎপরতার বিপরীতে শুভ, সত্য ও সুন্দরের বিজয় ও বিশ্বের মানবমণ্ডলীর মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

শারদীয় এই দুর্গোৎসবের সঙ্গে বাংলার প্রকৃতিরও রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। শরতের শুভ্র কাশফুলের মতো মানব হৃদয়েও পুণ্যের শ্বেতশুভ্র পুষ্পরাশি প্রস্ফুটিত হোক। অসুরকে বধ ও অশুভকে বিনাশ করে মানব মনে সঞ্চারিত হোক শুভ চেতনা-আজ এই হোক বিজয়া দশমীর প্রার্থনা, মানবমন্ডলীর কামনা।

Print Friendly, PDF & Email