বাঙালিনিউজ

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ০৫ জুন ২০১৯ বুধবার, পবিত্র ঈদুল ফিতর। সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। ঈদুল ফিতর ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি। দ্বিতীয়টি হলো ঈদুল আযহা। দীর্ঘ এক মাস রোযা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর, মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্যপালনসহ খুব আনন্দের সঙ্গে পালন করে থাকেন।

হিজরি বর্ষপঞ্জী অনুসারে রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উৎসব পালন করা হয়। তবে এই পঞ্জিকা অনুসারে কোনও অবস্থাতে রমজান মাস ৩০ দিনের বেশি দীর্ঘ হবে না। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের সমাপ্তিতে শাওয়ালের প্রারম্ভ গণনা করা হয়। ঈদের আগের রাতটিকে ইসলামী পরিভাষায় লাইলাতুল জায়জা‌ (পুরস্কার রজনী) এবং চলতি ভাষায় “চাঁদ রাত” বলা হয়।

শাওয়াল মাসের চাঁদ অর্থাৎ সূর্যাস্তে একফালি নতুন চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদ হয়, এই কথা থেকেই চাঁদ রাত কথাটির উদ্ভব। ঈদের চাঁদ স্বচক্ষে দেখে তবেই ঈদের ঘোষণা দেয়া ইসলামী বিধান। আধুনিক কালে অনেক দেশে গাণিতিক হিসাবে ঈদের দিন নির্ধারিত হলেও, বাংলাদেশে ঈদের দিন নির্ধারিত হয় দেশের কোথাও না-কোথাও চাঁদ দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে।

দেশের কোনও স্থানে স্থানীয় ভাবে চাঁদ দেখা গেলে, যথাযথ প্রমাণ সাপেক্ষে ঈদের দিন ঠিক করা হয়। গতকাল ০৪ জুন মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ব্রিফিংয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, “বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। সেই অনুযায়ী, আগামীকাল বুধবার সারাদেশে যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে।”

মঙ্গলবার রাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মুকাররম সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির দ্বিতীয় দফা বৈঠক শেষে এ তথ্য জানানো হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার আকাশে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। সেই অনুযায়ী, আগামীকাল বুধবার সারাদেশে যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে।

তিনি বলেন, সভায় ১৪৪০ হিজরি সনের পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা সম্পর্কে সকল জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর ৬৪ জেলা কার্যালয়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। এমতাবস্থায়, আগামীকাল বুধবার সারাদেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে।

বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সোমবার এক বাণীতে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীসহ বিশ্ববাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ঈদ সবার মধ্যে গড়ে তোলে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন। ঈদুল ফিতরের শিক্ষা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, গড়ে উঠুক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ—এ প্রত্যাশা করি।’

পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসী ও বিশ্বের সব মুসলমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আত্মশুদ্ধি, সংযম, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন পরিব্যাপ্তি লাভ করুক—এটাই হোক ঈদ উৎসবের ঐকান্তিক কামনা। হাসি-খুশি ও ঈদের অনাবিল আনন্দে প্রতিটি মানুষের জীবন পূর্ণতায় ভরে উঠুক।

ঈদের দিন ভোরে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। ইসলামিক বিধান অনুসারে ২ রাকাত ঈদের নামাজ ৬ তাকবিরের সাথে ময়দান বা বড় মসজিদে পড়া হয়। ফযরের নামাযের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের নামাযের সময় হয়। এই নামায আদায় করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব।

ইমাম কর্তৃক শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পূর্বে খুৎবা (ইসলামিক বক্তব্য) প্রদানের বিধান থাকলেও ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে তা নামাজের পরে প্রদান করার নিয়ম ইসলামে রয়েছে। ইসলামের বর্ননা অণুযায়ী ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে খুৎবা প্রদান ইমামের জন্য সুন্নত; তা শ্রবণ করা নামাযীর জন্য ওয়াজিব।

সাধারণত: ঈদের নামাজের পরে মুসলমানরা সমবেতভাবে মুনাজাত করে থাকেন এবং একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের সম্ভাষণ বিনিময় করে থাকে। ঈদের বিশেষ শুভেচ্ছাসূচক সম্ভাষণটি হলো, “ঈদ মুবারাক”।

মুসলমানদের বিধান অনুযায়ী ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার আগে একটি খেজুর কিংবা খোরমা অথবা মিষ্টান্ন খেয়ে রওনা হওয়া সওয়াবের (পূন্যের) কাজ। ঈদুল ফিতরের ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশসমূহের মধ্যে রয়েছে গোসল করা, মিসওয়াক করা, আতর-সুরমা লাগানো, এক রাস্তা দিয়ে ঈদের মাঠে গমন এবং নামাজ-শেষে ভিন্ন পথে গৃহে প্রত্যাবর্তন।

এছাড়া সর্বাগ্রে অযু-গোসলের মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার বিধানও রয়েছে। ইসলামে নতুন পোশাক পরিধান করার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, বিভিন্ন দেশে তা বহুল প্রচলিত একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের রমযান মাসের রোযার ভুলত্রুটির দূর করার জন্যে ঈদের দিন অভাবী বা দুঃস্থদের কাছে অর্থ প্রদান করা হয়, যেটিকে ফিৎরা বলা হয়ে থাকে। এটি প্রদান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিৎরা আদায় করার বিধান রয়েছে। তবে ভুলক্রমে নামাজ পড়া হয়ে গেলেও, ফিৎরা আদায় করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে।

ফিৎরার ন্যূনতম পরিমাণ ইসলামী বিধান অণুযায়ী নির্দিষ্ট। সাধারণত ফিৎরা নির্দিষ্ট পরিমাণ আটা বা অন্য শস্যের (যেমন-যব, কিসমিস) মূল্যের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। সচরাচর আড়াই সের আটার স্থানীয় মূল্যের ভিত্তিতে ন্যূনতম ফিৎরার পরিমাণ নিরূপণ করা হয়।

স্বীয় গোলাম-এর ওপর মালিক কর্তৃক ফিৎরা আদায়যোগ্য হলেও বাসার চাকর/চাকরানি অর্থাৎ কাজের লোকের ওপর ফিৎরা আদায়যোগ্য নয়; বরং তাকে ফিৎরা দেয়া যেতে পারে। ইসলামে নিয়ম অনুযায়ী, যাকাত পাওয়ার যোগ্যরাই ফিৎরা লাভের যোগ্য।

ঈদের দিনে সকালে প্রথম আনুষ্ঠানিকতা হল নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া। ঈদের নামাজ সবার জন্য। নামাজের পর সবাই একসাথে হন, পরস্পরের সঙ্গে দেখা করেন। ঈদের দিনে সালামি গ্রহণ করা প্রায় সব দেশেই রীতি আছে। তবে এর ধর্মীয় কোনও বাধ্যবাধকতা বা রীতি নেই।

ঈদের দিনে সেমাই সবচেয়ে প্রচলিত খাবার। আরও অনেক বিশেষ ধরনের খাবার ধনী গরিব সকলের ঘরে তৈরি করা হয়। এই উৎসবের আরও একটি রীতি হল, আশেপাশের সব বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া এবং প্রত্যেক বাড়িতেই হালকা কিছু খাওয়া। এ রীতি বাংলাদেশে সবাই মেনে থাকেন।

বাংলাদেশ সহ অন্যান্য মুসলিম-প্রধান দেশে ঈদুল ফিতরই হলো বৃহত্তম বাৎসরিক উৎসব। বাংলাদেশে ঈদ উপলক্ষে সারা রমজান মাস ধরে সন্ধ্যাবেলা কেনাকাটা চলে। অধিকাংশ পরিবারে ঈদের সময়েই নতুন পোশাক কেনা হয়।

পত্র-পত্রিকাগুলো ঈদ উপলক্ষে ‘ঈদ সংখ্যা’ নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে থাকে। ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েকদিন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করে। ঈদের চাঁদ দেখার সময়কার আনন্দমুখর পরিবেশকে নিয়ে লেখা ও সুর করা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” গানটি বেশ জনপ্রিয়। ঈদের দিনে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে এই গানটি বাজানো হয়। অনেকের মুখে মুথে এ গানটি থাকে।

ঈদের দিন ঘরে ঘরে সাধ্যমত বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। ঈদের দিনে সেমাই বা অন্যান্য মিষ্টি নাস্তা তৈরি করার চল রয়েছে। বাংলাদেশের শহরগুলো থেকে ঈদের ছুটিতে প্রচুর লোক নিজেদের আদি নিবাসে বেড়াতে যান। এ কারণে ঈদের সময়ে রেল, সড়ক ও নৌপথে প্রচণ্ড ভিড় হয়। অনেকে ঈদের সময় বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যান।

Print Friendly, PDF & Email