বাঙালিনিউজ
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ

আজ ১৭ মার্চ ২০১৯ রোববার, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ের শততম জন্মদিন। বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলার ইতিহাসের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন, ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে, সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান। মাতার নাম শেখ সাহেরা খাতুন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন মা-বাবার তৃতীয় সন্তান।

শেখ মুজিবুর রহমান শিশুকালে ‘খোকা’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারি, ইতিহাস নির্মাতা এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি।

তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র, তখনই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এই কিশোর বয়সেই তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। তারপর জীবনে অসংখ্যবার কারাগারে গেছেন তিনি। পাকিস্তানী সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের ২৩ বছরে অসংখ্যবার তিনি কারাগারে গেছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান স্কুল জীবনে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বৈরী পরিবেশ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ক্রমশ সামনের দিকে প্রগতির পথে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মুক্তির শপথে এগিয়ে গেছেন। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ভর্তির পর তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়ে যায়। এ সময় তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নের সময় বাংলার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও আবুল হাশিমসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। নিজেকে ছাত্র-যুবনেতা হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পরপরই, ঢাকায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নিয়ে, স্বপ্ন ও সাধনা নিয়ে অগ্রসর হন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।। আর সে কারণে তিনি সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়রি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ বিরোধী প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেন। আর তাই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হবার সময় কারাবন্দী অবস্থায় বাংলার সম্ভাবনাময় নেতা শেখ মুজিবকে দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব। ফলে বিপুল ভোটে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভায় শপথ নেন তিনি ৩৪ বছর বয়সে, সবচেয়ে কম বয়সী মন্ত্রী হিসাবে।

১৯৫৮ সালের জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও ৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসন বিরোধী সব আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তথা বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন তিনি।

১৯৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালির এক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন । শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের প্রাদেশিক ও জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর, বঙ্গবন্ধু সাংবিধানিক ভাবে দেশটির মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক স্বৈরশাসক গোষ্ঠী ও তাদের রাজনৈতিক দোসররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর বিজয়ী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করেন। ফলে ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর এই ঐতিহাসিক ভাষণেই সুকৌশলে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ডাক’ দেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্ততি নেয়।

তারপর হঠাৎ করে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে বাঙালি নিধণযজ্ঞ শুরু করে। ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পূর্ব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা মোতাবেক আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে। তিনি শত্রুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শ চেতনা প্রেরণা ও নির্দেশনা হৃদয়ে ধারণ করে বীর বাঙালি ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়। ফলে জন্ম হয় বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন সাধনা ও সংগ্রামের প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ এক সাগর রক্ত পেরিয়ে। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে, অপরিমেয় ত্যাগ-তিতিক্ষার সংমিশ্রণে।

আর সে কারণেই ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত স্বদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ তাঁর জীবনের স্বপ্ন, সাধ, লক্ষ্য ছিল—বাঙালিকে স্বাধীন করা, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। তাই তিনি বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন সঞ্চারিত করেছিলেন, স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর কারণেই স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হয়ে গেছে। আর সে জন্যই তিনি আমাদের ‘স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি’।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের ফলে বাঙালি ের আসনে অধিষ্ঠিত হন। বাংলা ও বাঙালির চিরদিনের, চিরকালের আপনজন, প্রাণের মানুষ হিসেবে হৃদয়াসনে প্রতিষ্ঠিত হন।

কিন্তু সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু যখন অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে এগিয়ে নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই-স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রে পাকবাহিনীর ক্রীড়ানক ও গুপ্তচর সেনা সদস্যের গুলিতে রাতের অন্ধকারে সপরিবারে নিহত হন। এই নির্মম ও বর্বরতম হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর অন্যতম ট্রাজেডি। বাঙালির এই শোকগাথা অনন্তকাল বিশ্ববাসীর হৃদয়ে জাগরুক থাকবে। আর বাঙালি এই চিরদিনের শোক থেকে শক্তি নেবে, তাঁর চেতনা ও প্রেরণায় মুক্তির পথে এগিয়ে যাবে নিরন্তর-নিরবধি।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে রক্তের ঋণ রক্ত দিয়ে শোধ করার কথা বলেছিলেন! তিনি কথা রেখেছেন। রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে-বাংলার মানুষের ভালোবাসার রক্তঋণ শোধ করে গেছেন। বাঙালিকে চিরদিনের জন্য ভালোবাসার ঋণেও বেঁধে গেছেন। যে ঋণ বাঙালি ও বাংলাদেশ কোনো দিন শোধ করতে পারবে না, যতদিন এই দেশ এই ভূখণ্ড এই আকাশ বাতাস নদী প্রকৃতি থাকবে।

কারণ, এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু বারবার জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু কখনো আপস করেননি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তাঁকে গুলি করে মারার তথা হত্যার ষড়যন্ত্রও হয়েছিল। একাত্তর সালে পাকিস্তানের কারাগারে তাঁর সেলের পাশে কবর খোঁড়া হয়েছিল।

কিন্তু তিনি ছিলেন অকুতভয়। বাঙালি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার শপথে অটুট-অটল। মৃত্যুকে কখনো ভয় পাননি তিনি। তিনি মৃত্যুঞ্জয়, তিনি অমর-তিনি বাঙালি চির অহংকার চির বিস্ময়। কারণ একমাত্র তিনিই বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ।’

বঙ্গবন্ধুর শপথ ছিল-পণ ছিল, তিনি মৃত্যুবরণ করবেন, তবু বাংলার মানুষের মুক্তির প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না। তাই তো তিনি বলেছিলেন, তাঁর বড় গুণ হলো বাংলার মানুষকে তিনি ভালোবাসেন। তাঁর দুর্বলতা প্রশ্নেও বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাংলার মানুষকে তিনি বড় বেশি ভালোবাসেন। বাংলার মানুষও তাঁকে বড় বেশি ভালোবাসেন। তাই তো তিনি বাঙালির জীবনের ধ্রুবতারা। আাঁধারের আলোকবর্তিকা। মুক্তি পথের চিরসাথী, চিরপ্রেরণা।

বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে হাজার বছরের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাধনার স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছেন। স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। দিয়েছেন জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত আর ৫৬ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের মানচিত্র। তিনি বাঙালিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার শক্তি দিয়েছেন, আত্মপরিচয় শনাক্ত করবার অপার সাহস ও সুযোগ দিয়েছেন। আর দিয়েছেন আত্মসম্মানবোধ ও রুখে দাঁড়াবার স্পর্ধা।

আজ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে- তাঁরই মূলমন্ত্রে, তাঁরই স্বপ্ন ও আদর্শে, তাঁরই চেতনার আলোকে, প্রেরণার পথে। তাঁর সুযোগ্য কন্যা, বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি আজ সুদৃঢ় ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাঙালি আজ বিশ্বের বুকে গর্বিত জাতি। বাংলাদেশ আজ অর্থনীতির রোল মডেল। আর তাই বাঙালি কবি অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছেন, ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’।

দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক সাংবাদিক গবেষক
প্রকাশের তারিখ: ১৭ মার্চ ২০১৯, রোববার
ই-মেইল: dyutimoybulbul@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Related posts