বাঙালিনিউজ

দ্যুতিময় বুলবুল
বাঙালিনিউজ

আজ ২২ শ্রাবণ ১৪২৬, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে পৈতৃক বাসভবনে বাংলা ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে (ইংরেজি ৭ আগস্ট ১৯৪১ সাল) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাণপুরুষ ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়ান ঘটে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর ৩ মাস।

বাংলা সাহিত্যের এই শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল প্রতিভা ও প্রধান কবি বাংলা ১২৬৮ সালের পঁচিশে বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৬১ সালের ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ব্রাহ্ম ধর্মগুরু মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী।

ভারতবর্ষের বিখ্যাত জমিদার প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তা। তাঁর পূর্বপুরুষেরা খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে বাস করতেন।

আধুনিক বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান রূপকার এবং বাঙালি জাতির মনন ও মানস গঠন এবং বাঙালির বোধ ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ নির্মাতা তথা বাঙালির জীবনের ধ্রুবতারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রজনীর অন্ধকার যেমন দূর করে রবির কিরণ, তেমনি রবীন্দ্রনাথ তাঁর আপন প্রতিভার আলোয় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে উদ্ভাসিত করেছেন। বাঙালি জাতিকে জ্ঞানে ও চিন্তায় সমৃদ্ধ করেছেন। বিশ্বসভায় পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদাপূর্ণ আসনে বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দিয়েছেন।

কবিতা, সংগীত, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, চিত্র অঙ্কন, ভ্রমণকাহিনি, শিশুতোষ রচনাসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখা তাঁর প্রতিভার স্পর্শে দ্যুতিময় হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে তিনি সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক, ভাষাবিদ, পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগী, বিদ্যানিকেতন প্রতিষ্ঠাতা, সাহিত্য আলোচক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী এবং সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার অদূরে বীরভূম জেলার বোলপুরে শান্তি নিকেতন খ্যাত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর অমর সৃষ্টি।

বাল্যকালে প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেননি; গৃহশিক্ষক রেখে বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মাত্র ৮ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় তার প্রথম লেখা কবিতা ‘অভিলাষ’ প্রকাশিত হয়।

১৮৭৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশিত হয়। এ সময় থেকেই কবির বিভিন্ন ধরনের লেখা দেশ-বিদেশে পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেতে থাকে। এই ১৮৭৮ সালেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান।

রবীন্দ্রনাথ ২২ বছর ৭ মাস বয়সে ৯ ডিসেম্বর ১৮৮৩ সালে জোড়াসাঁকোস্থ তাঁর পৈতৃক বাড়িতে ১০ বছরের ভবতারিণী দেবীর (পরে নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী) সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর মাত্র ২৯ বছর বয়সে মৃণালিনী দেবী মৃত্যুবরণ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৪১ বছর ৬ মাস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মৃণালিনী দেবীর তিন মেয়ে ও দুই ছেলে সহ মোট ৫ সন্তানের জনক ও জননী ছিলেন। তাঁদের সন্তানরা হলেন-বড় মেয়ে মাধুরীলতা দেবী (বেলা), বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রথী), মেঝ মেয়ে রেনুকা দেবী (রানী), ছোট মেয়ে মীরা দেবী (অতসী) ও ছোট ছেলে সমীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সমী)।

রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ সালে পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন। ১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯০২ সালে তাঁর পত্নীবিয়োগ হয়। রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। প্রথম বাঙালি হিসেবে তিনি নোবেল পুরস্কার জয় করেন, অনন্য রেকর্ড গড়েন ৫৩ বছর বয়সে। রবীন্দ্রনাথই প্রথম এশিয়ার মধ্যে সাহিত্যে নোবেল জয়ী কবি।

১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন। ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি শ্রীনিকেতন নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘজীবনে তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সমগ্র বিশ্বে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেন। ১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর কলকাতার পৈত্রিক বাসভবনেই তাঁর মৃত্যু হয়।

জীবিতকালে রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত মৌলিক কবিতাগ্রন্থ সংখ্যা ৫২টি, উপন্যাস ১৩টি, ছোটোগল্পের বই ৯৫টি, প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ ৩৬টি, নাটকের বই ৩৮টি। কবির মত্যুর পর ৩৬ খণ্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া ১৯ খণ্ডের রয়েছে ‘রবীন্দ্র চিঠিপত্র’। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত কবির আঁকা চিত্রকর্মের সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৭৪টি চিত্রকর্ম শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে।

কবি ২ হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। অধিকাংশ গানে তিনি সুরারোপ করেছেন। তার সমগ্র গান ‘গীতবিতান’ গ্রন্থে রয়েছে। কবির লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে গানটিও তাঁর লেখা।

একই লেখকের লেখা গান দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত, এমন নজির পৃথবীতে বিরল। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পকলায় এক অনন্য মাত্রা সংযোজন করেছে। আর তাঁর দর্শন ও চিন্তাধারা বাঙালি তথা ভারতবাসীর জীবনে চির আবেদনময়।

একজন মহান কবি, অসাধারণ সৃষ্টিশীল লেখক ও কালজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে সমসাময়িক বিশ্বে তিনি সবচেয়ে খ্যাতিমানদের অন্যতম। আর ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথই প্রধান সাহিত্য স্রষ্ঠা। রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলা ভাষা নয়, ইংরেজি ভাষায়ও প্রচুর লিখেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের পাঠ্যসূচিতে তার লেখা সংযোজিত হয়েছে।

বাঙালির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাসহ সকল হৃদয়ানুভূতি ও অভিব্যক্তির সার্থক প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের বিপুল সাহিত্য ও সঙ্গীত সম্ভারে। তাঁর বিচিত্র রচনাবলী এবং মানবিক চেতনা ও প্রেমময় সৃষ্টির জগত বাঙালি জাতিসহ সারা ভারতবর্ষ তথা বিশ্ববাসীকে বিমোহিত করেছে। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিশীল লিখনির আবেদন আজও সমানভাবে সারাবিশ্বে সমহিমায় সমুজ্জ্বল। তিনি বাঙালির চিরদিনের প্রাণের মানুষ, হৃদয়ের আপনজন। তাই সব সময় বাঙালি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির মধ্যেই সুখের আনন্দ ও দুঃখের আশ্রয় খোঁজেন, খোঁজেন আপন ঠিকানা।

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি সমাজসংস্কার, শিক্ষাবিস্তার, কৃষি উন্নয়নসহ নানা সৃজনশীল কর্মে আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। এ ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। জীবনের শেষ ধাপে কবি গভীর আগ্রহে চিত্রকলা চর্চা করেন। তাঁর কর্ম, চিন্তা, চেতনা ও সৃষ্টি সম্ভার বাঙালির ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সকল আন্দোলন-সংগ্রামের পথিকৃত এবং বাঙালির সকল অগ্রযাত্রায় অনন্ত প্রেরণা।

তাই পঁচিশে বৈশাখ কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তি এবং বাইশে শ্রাবণ তাঁর মহাপ্রয়াণবার্ষিকী বাঙালির জীবনে চির স্মরণীয় ও বরণীয় দুটি দিন। বাঙালি আজ ২২ শ্রাবণ হৃদয়ের সকল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবস স্মরণ করছে।

Print Friendly, PDF & Email