বাঙালিনিউজ
১৯০৩ সালের ৬ জানুয়ারি মিলেভার বিয়ে হয়েছিল আইনস্টাইনের সঙ্গে। ফাইল ছবি

বাঙালিনিউজ
বিজ্ঞান-প্রযুক্তিডেস্ক

বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের প্রথম স্ত্রী ছিলেন মিলেভা আইনস্টাইন-মারিক। তিনিও ছিলেন অনেক বড় মাপের বিজ্ঞানী। যাঁর প্রতিভা কোনও অংশেই কম ছিল না আইনস্টাইনের চেয়ে। আইনস্টাইন নিজেই সেটা স্বীকার করেছেন মিলেভার কাছে চিঠি লিখে।

কিন্তু মিলেভা সেভাবে সহযোগিতা পান নি। না ঘরে, না বাইরে। পেলে হয়তো পদার্থবিজ্ঞান আরো অনেক কিছু পেত। আরো অনেকটা বদলে যেত পৃথিবী। সদ্য প্রকাশিত ‘আইনস্টাইন’স ওয়াইফ: দ্য রিয়েল স্টোরি অফ মিলেভা আইনস্টাইন-মারিক’ শীর্ষক একটি বই এই কথা বলা হয়েছে।

নিজে বহুদর্শী ছিলেন বলেই হয়তো তাঁর বাগদত্তা মিলেভার বিজ্ঞান প্রতিভার আভাস অনেক আগেই পেয়েছিলেন আইনস্টাইন। যার ইঙ্গিত মিলেছে প্রণয়ী মিলেভাকে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে। আইনস্টাইন ১৯০০ সালের অক্টোবরে মিলেভাকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমি খুবই ভাগ্যবান যে তোমার মতো এক জনকে পেয়েছি। এমন একটা প্রাণী, যে একেবারে আমারই মতো। আমার সমান।”

হফ্‌টস্ট্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ডেভিড সি ক্যাসিডি-সহ তিনজন লেখকের ওই গবেষণামূলক বইটিতে অনেক অজানা তথ্য এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, যে প্রতিভাকে অনেক আগেই বুঝতে, চিনতে পেরেছিলেন আইনস্টাইন, সেই মিলেভার প্রতিভার বিকাশে কিন্তু ততটা ভূমিকা ছিল না কিংবদন্তী বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের।

বইটি থেকে জানা যাচ্ছে, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত শাস্ত্রে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল আইনস্টাইনের স্ত্রী মিলেভার। তবু ওই সময়ের অনেক মহিলা বিজ্ঞানীর মতোই মিলেভাও হারিয়ে গিয়েছিলেন উপেক্ষায়। মর্যাদা, উৎসাহ না পাওয়ার ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে। তাঁর স্বামী আইনস্টাইন বলে যেটা অন্তত তাঁর ক্ষেত্রে হওয়ার কথা ছিল না।

বইটিতে মিলেভার শৈশব নিয়ে বিশদে লিখেছেন অধ্যাপক ক্যাসিডি। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ রুথ লিউইন সাইম লিখেছেন, বিশ শতকে মিলেভার মতো মহিলা বিজ্ঞান-প্রতিভাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কী ভাবে মরণ-বাঁচন লড়াইটা লড়তে হয়েছিল। আর ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ ও পদার্থবিদ অ্যালেন এস্টারসন লিখেছেন আইনস্টাইনের সঙ্গে মিলেভার প্রণয়, দাম্পত্য, বিবাহ বিচ্ছেদ আর তার পরের দিনগুলো নিয়ে।

এস্টারসন লিখেছেন, “সেটা এমন একটা সময় ছিল, যখন বিজ্ঞানের দুনিয়ায় কোনও কদরই পেতেন না মহিলারা। মহিলাদের দিয়েও যে বিজ্ঞানের গবেষণা হয়, সেটা কেউ ভাবতেই চাইতেন না। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে, কিছুটা বিপন্ন শৈশবের নানা রকমের বাধা কাটিয়ে মিলেভা পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। আর বিজ্ঞানের ওই দু’টি জটিলতম শাখাতেও দেখিয়েছিলেন চমকে দেওয়ার মতো ব্যুৎপত্তি। কিন্তু তার পর আর পারেননি। হারিয়ে গিয়েছিলেন আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার পর। ডুবে গিয়েছিলেন গভীর মানসিক অবসাদে।’’

আইনস্টাইন ১৯০৩ সালের ৬ জানুয়ারি মিলেভা মেরিককে বিয়ে করেন। স্ত্রী মিলেভা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন, ‘মিলেভা এমন এক সৃষ্টি যে আমার সমান এবং আমার মতোই শক্তিশালী ও স্বাধীন।’ আইনস্টাইনের স্ত্রী মিলেভার ছিলেন জুরিখ পলিটেকনিকে তার সেকশনের একমাত্র নারী শিক্ষার্থী। মিলেভার ছিলেন একজন সম্ভাবনাময়ী পদার্থবিদ। কিন্তু আইনস্টাইনের সঙ্গে বিয়ে ও সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি ক্যারিয়ার দূরে ঠেলে দেন।

আইনস্টাইনের সঙ্গে বিয়ের আগেই মিলেভার গর্ভে একটি কন্যা শিশুর জন্ম হয়। ইতিহাসবিদের মতে শিশুটি হয়তো অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিল অথবা তাকে অন্য কোনো পরিবারে দত্তক দেওয়া হয়েছিল। আইনস্টাইন এবং তার স্ত্রী মিলেভা মেরিকের দ্বিতীয় সন্তান এডওয়ার্ড আইনস্টাইন। তার ডাক নাম ছিল TETE। এডওয়ার্ড সিজোফ্রিনিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। আইনস্টাইন এতে মোটেই অবাক হননি। কারণ, তার স্ত্রী মিলেভার বোন ও সিজোফ্রিনিক রোগী ছিলেন।

১৯১৯ সালে মিলেভার সাথে আইনস্টাইনের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। মিলেভাকে ডিভোর্সের জন্য রাজি করাতে আইনস্টাইন তার নোবেল প্রাইজ মানির প্রায় পুরোটাই স্ত্রীকে দেন। তখন নোবেল প্রাইজ মানি হিসেবে ৩২ হাজার ২৫০ ডলার দেওয়া হতো, যা কোনো প্রফেসরের বার্ষিক বেতনের প্রায় দশ গুণ।

বিচ্ছেদের পরেও মিলেভা এডওয়ার্ডের দেখা শুনা করতেন। একসময় এডওয়ার্ডকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ইউরোপে থাকার সময় আইনস্টাইন প্রায়ই তার ছেলেকে দেখতে যেতেন। যখন আমেরিকা চলে গেলেন তখন তিনি ছেলেকে চিঠি লিখতেন। চিঠিগুলোতে আইনস্টাইন তার ছেলেকে দেখার ইচ্ছা ব্যাক্ত করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং তাদের আর দেখা হয়নি।

আইনস্টাইনের স্ত্রী মিলেভা মারা যান ১৯৪৮ সাল। এডওয়ার্ড হাসপাতালেই থেকে যান। ৬৫ সালে তিনি মারা যান। মিলেভার সঙ্গে ডিভোর্সের পর আইনস্টাই বিয়ে করেন এলসাকে। এলসা ছিলেন আইনস্টাইনের আপন খালাতো বোন।

১৯৩৫ সালে আইনস্টাইনের সঙ্গে পরিচয় হয় মারগারেট কোনেনকোভার। অচিরেই তা প্রণয়ে রূপ নেয়। ১৯৯৮ সালে নয়টি প্রেমপত্র নিলামে তোলা হয়, যা ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালে আইনস্টাইন ও কোনেনকোভা আদান-প্রদান করেছিলেন। একজন রাশিয়ান গুপ্তচরের লেখা বই থেকে জানা যায় কোনেনকোভা আসলে ছিলেন একজন রাশিয়ান এজেন্ট। তবে এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে।

গবেষণা ছাড়া বাকি সময়টুকু আইনস্টাইন কাটাতেন তার নারী বন্ধুদের সাথে। কখনো বেহালা বাজিয়ে। কখনো চিঠি লিখে। তবে সেই অর্থে তিনি খারাপ স্বামী কিংবা বাবা ছিলেন না। আইনস্টাইন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কেও জড়িয়েছিলেন। তার বান্ধবী ছিল ৬ জন। এস্টেলা, এথেল, টনি এবং মারগারিটা। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা সহ একাধিক অনলাইন নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email