বাঙালিনিউজ
এবার ভারতের ‘সেরা অভিনেতা’ বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছেন বলিউড অভিনেতা আয়ুষ্মান খুরানা। ছবি: সংগৃহীত

বাঙালিনিউজ
বিনোদনডেস্ক

এবার ভারতের ‘সেরা অভিনেতা’ বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছেন বলিউড অভিনেতা আয়ুষ্মান খুরানা। ৩৪ বছর বয়সের এই অভিনেতার ঝুলিতে রয়েছে তিনটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। এর মধ্যে একটি আবার সেরা সংগীতশিল্পী হিসেবে।

আয়ুষ্মান খুরানা ২০১২ সালে প্রথম অভিনয় করেন ‘ভিকি ডোনার’ ছবিতে। বলিউডে যাত্রা শুরু হওয়ার পর গত ০৯ আগস্ট ২০১৯ শুক্রবার তিনি প্রথম ভারতের ৬৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন। ওই দিন এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তবে চণ্ডীগড়ের ছেলেটির কাছে ‘ভিকি ডোনার’ থেকে শুরু করে জাতীয় পুরস্কার জয়ের পথ বিশেষ কুসুমকোমল ছিল না।

আয়ুষ্মানের জন্মের পরে বাবা মা নাম রেখেছিলেন ‘নিশান্ত’। কিন্তু সে নাম পাল্টে দেন তাঁরাই, ছেলের তিন বছর বয়সে। নতুন নাম রাখা হয় ‘আয়ুষ্মান’। পরিবারে অভিনয়ের শিকড় না থাকলেও, নিজেকে অভিনেতা হিসেবে বলিউডে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

আয়ুষ্মানের জন্ম চণ্ডীগড়ে, ১৯৮৪-র ১৪ সেপ্টেম্বর। তাঁর বাবা পি খুরানা একজন জ্যোতিষী। মা অনিতা মায়ানমারের মেয়ে, গৃহবধূ। সেন্ট জনস হাইস্কুলের পরে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আয়ুষ্মানের পড়াশোনা ডিএভি কলেজে। এরপর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর করেন।

তিনি সেই বিরল কুশীলবদের মধ্যে একজন, যিনি অভিনয়ের পাশাপাশি ভালবাসেন বই পড়তে, কবিতা লিখতে, গান করতে। হিন্দিতে নিয়মিত লেখেন নিজের ব্লগে। বহু নেটিজেনই তাঁর ব্লগের গুণমুগ্ধ পাঠক।

বাবা-মা’র সঙ্গে শিশু আয়ুষ্মান

চার বছর বয়সে ‘তেজাব’ ছবিতে মাধুরী দীক্ষিতকে দেখেই নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন আয়ুষ্মান। অভিনয়ের ইচ্ছে বাস্তবে পরিণত হয় কলেজ জীবনে, থিয়েটার দিয়ে। সঙ্গে টেলিভিশনে রিয়েলিটি শো করেছেন তিনি। ২০০৪ সালে রোডিজ ২-এ জয়ী ২০ বছর বয়সে। প্রথম চাকরি দিল্লিতে, রেডিও জকি হিসেবে। এরপর বিভিন্ন চ্যানেলে রিয়েলিটি শো সঞ্চালনা করেছেন।

বড় পর্দায় আয়ুষ্মানের আত্মপ্রকাশ ২০১২ সালে, সুজিত সরকারের ‘ভিকি ডোনার’ ছবিতে। ওই ছবিতে তিনি গানও গেয়েছিলেন। প্রথম ছবিতেই জোড়া ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। সেরা অভিনেতা ও সেরা প্লে ব্যাক গায়কের পুরস্কার।

কেরিয়ারের শুরু থেকেই একটু অন্য রকম ছবিতে অভিনয় করতে ভালবাসেন। ‘বরেলী কি বরফি’, ‘দম লাগা কে হাইসা’, ‘বধাই হো’, ‘অন্ধাধুন’ এবং ‘আর্টিকল ১৫’ প্রভূতি আয়ুষ্মানের সেই ‘অন্য রকম’ ধারার ছবি, যা তাকে অভিনয়ে জোরালো ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর ছবি সামাজিক বার্তাও পৌঁছে দেয়।

দীর্ঘ দিনের প্রেমিকা তাহিরা কাশ্যপকে আয়ুষ্মান বিয়ে করেন ২০০৮ সালে। তাঁদের আলাপ ক্লাস টুয়েলভে, ফিজিক্স কোচিং ক্লাসে। আয়ুষ্মানের নাম প্রথমে তাহিরা জানতেন ‘অভিষেক’ বলে।

আয়ুষ্মান-তাহিরার ছেলে বীর্যবীরের জন্ম ২০১২ সালে। তার দু’বছর পর সংসারে নতুন অতিথি, তাহিরা-আয়ুষ্মানের মেয়ে, বরুষ্কা। আয়ুষ্মানের ভাই অপারশক্তিও একজন রেডিয়ো জকি। তিনি অভিনয় করেছিলেন আমির খানের ‘দঙ্গল’ ছবিতে।

স্ত্রী তাহিরার সঙ্গে আয়ুষ্মা

২০১৮ সালে আয়ুষ্মান-তাহিরার দাম্পত্যে আসে অপ্রত্যাশিত আঘাত। ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ে তাহিরার। আয়ুষ্মান পরে বলেছেন, এ কথা জানার পরে বেশ কয়েক দিন বিনিদ্র রজনী কাটান তিনি। তাহিরার মানসিক শক্তিই তাঁকে প্রেরণা দিয়েছে লড়াই করার জন্য।

সে সময় সকালে শুটিং, সিনেমার প্রচারে ব্যস্ত থাকতেন আয়ুষ্মান। রাতে হাসপাতালে যেতেন স্ত্রীর কাছে। তাহিরাও জানিয়েছেন, আয়ুষ্মানকে ছাড়া তিনি ক্যানসারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এগোতে পারতেন না। কেমোথেরাপির পরে এখন রোগমুক্তির পথে তাহিরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি শেয়ার করেছিলেন কেমোথেরাপির পরে তাঁর কেশহীন মাথার ছবি।

তবে তাঁদের সংসার জীবনেও এক সময় অশান্তি হয়েছে। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে তাহিরা নিজেই তা জানিয়েছেন। বলেছেন, তিনি ‘ভিকি ডোনার’ ছবিতে স্বামীকে কিস করতে দেখে মেনে নিতে পারেননি। আরও নানা কারণে চেয়েছিলেন ডিভোর্স করতে। কিন্তু সম্পর্ক ধরে রেখেছেন আয়ুষ্মানই। আয়ুষ্মানের পাশাপাশি তাহিরাও কলম ধরেছিলেন আয়ুষ্মানের জীবনী ‘ক্র্যাকিং দ্য কোড-মাই জার্নি টু বলিউড’-এর জন্য।

প্রথম দিকে আয়ুষ্মানের বিপুল মহিলা ফ্যান ফলোয়িং দেখে রেগে যেতেন, বিরক্ত হতেন তাহিরা। এখন পাল্টে ফেলেছেন নিজেকে। বুঝেছেন, এ সবই তারকা-জীবনের অঙ্গ।

কলেজে পড়ার সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে দিল্লি-মুম্বই দূরপাল্লার ট্রেনের কামরায় গান গাইতেন আয়ুষ্মান। তাঁদের পারফরম্যান্সে খুশি হয়ে টাকা দিতেন যাত্রীরা। এক সাক্ষাৎকারে আয়ুষ্মান জানিয়েছেন, একবার এত টাকা জমেছিল, তাঁরা সবাই মিলে গোয়া বেড়াতে চলে গিয়েছিলেন।

অতীতের কথা মনে রেখে নিজেকে ‘ট্রেন সিঙ্গার’ বলতে ভালবাসেন ভারতের জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে যুগ্মভাবে সেরা নায়ক নির্বাচিত আয়ুষ্মান খুরানা।

স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আয়ুষ্মান

বহু গুণের আয়ুষ্মান খুরানা আবার কবিও। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া উপলক্ষে তিনি একটা কবিতা লিখেছেন। সেখানে তাঁর প্রথম মুম্বাই আসা থেকে শুরু করে গতকাল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার দীর্ঘ যাত্রা কবিতায় তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, প্রথম যেদিন এই শহরে এসেছিলেন, এসেছিলেন ট্রেনের সেকেন্ড ক্লাসে চড়ে। সঙ্গে বন্ধুরা ছিল। আজ এত বছর পর স্মৃতি হাতড়ে ফিরে গেছেন সেই যাত্রায়। শুকরিয়া করেছেন সেই দিনগুলোর। যখন হোঁচট খেয়ে পড়েছেন, আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন।

প্রতিবার হোঁচট খেয়ে পড়ার জন্য শুকরিয়া করেছেন। কেননা প্রতিবার পড়ে যাওয়ার জন্যই তিনি উঠে দাঁড়াতে শিখেছেন। আর তাই পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এই কবিতায় তিনি মা-বাবাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি। নায়ক, গায়ক, কবি আয়ুষ্মান খুরানা জীবন সংগ্রামে আজ জয়ী।

ভারতের সেরা হিন্দি ছবি হিসেবে পুরস্কার পাচ্ছে শ্রীরাম রাঘবান পরিচালিত বহুল আলোচিত ছবি ‘আন্ধাধুন’। এই ছবিতে অভিনয় করে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন আয়ুষ্মান খুরানা। এই ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন টাবু ও রাধিকা আপ্তে। আয়ুষ্মান অভিনীত আরও একটা ছবি এবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। সেই ছবির নাম ‘বাধাই হো’। সর্বাধিক জনপ্রিয় বিনোদনমূলক ছবি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে এটি।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই খুব কৃতজ্ঞ। আমি সব সময় অর্থপূর্ণ ও মানসম্পন্ন কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার চেষ্টা করেছি। আমার বিশ্বাস, পরিশ্রম আর অভিনয়কে ধ্যান-জ্ঞান করার জন্য এই স্বীকৃতি পেয়েছি। আমার ব্যক্তিগত জয় ছাড়াও আমার অভিনীত “আন্ধাধুন” ও “বাধাই হো” ছবি দুটিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছে। আমাদের দর্শক আবারও প্রমাণ করেছেন, তারা বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র দেখেন। আলোচনা ও সমর্থন করেন। আর আমি সেই ধরনের ছবির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতে চাই, যেগুলো দর্শককে সিনেমা হলে টেনে আনে।’

জাতীয় পুরস্কার পাওয়া আয়ুষ্মান খুরানাকে শিগগিরই দেখা যাবে ‘ড্রিম গার্ল’, ‘শুভ মঙ্গল জিয়াদা সাবধান’, ‘গুলাব সিতাব’ আর ‘বালা’ ছবিতে।

Print Friendly, PDF & Email