বাঙালিনিউজ
ব্র্যাকের চেয়ারপারসনের পদ থেকে অবসর নিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। ১৯৭২ সালে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আবেদ। তাঁর কর্ম দক্ষতায় ব্র্যাক এখন বিশ্বের ‘সর্ববৃহৎ’ এনজিও হিসেবে স্বীকৃত।

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাকের চেয়ারপারসনের পদ থেকে অবসর নিলেন। ৮৩ বছর বয়সী আবেদ ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারপারসনের দায়িত্বও ছেড়ে দিয়েছেন। গতকাল ০৬ আগস্ট ২০১৯ মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই এনজিও থেকে ফজলে হাসান আবেদের অবসরে যাওয়ার এই ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

ঘোষণায় জানানো হয়, চেয়ারপারসনের সক্রিয় পদটি ছেড়ে বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সর্ববৃহৎ এনজিওটিতে সম্মানসূচক ‘চেয়ার এমেরিটাস’ পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তাঁর বিদায়ে ব্র্যাকের পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারপারসনের পদে এসেছেন অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান, যিনি ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন।

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাকের পাশাপাশি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের পরিচালনা পর্ষদেরও চেয়ারপারসন ছিলেন। আবেদের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারপারসনের পদে এসেছেন জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল আমিরা হক।

চেয়ারপারসনের বিদায়ের সঙ্গে ব্র্যাকের পরিচালনা পর্ষদে সাতটি পদেও পরিবর্তন এসেছে বলে ওই অনুষ্ঠানে জানানো হয়। পরিবর্তন এসেছে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের পরিচালনা পর্ষদেও।

ব্র্যাকের বিদায়ী পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন মুশতাক চৌধুরী, তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ, লতিফুর রহমান, রোকিয়া আফজাল রহমান, লুভা নাহিদ চৌধুরী, মার্থা আলটার চেন, আদিব এইচ খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও সৈয়দ এস কায়সার কবির।

ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের বিদায়ী পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন সিলভিয়া বোরেন, শাবানা আজমী, দেবপ্রিয় ভট্টচার্য্য, শফিকুল হাসান কায়েস, আইরিন জুবাইদা খান, পারভিন মাহমুদা, মুশতাক চৌধুরী, ফওজিয়া রশিদ, ভিক্টোরিয়া সেকিটোলেকো ও মারিলো ফন গোলস্টেইন।

নৈশভোজের পর ব্র্যাকের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ব্র্যাকের এক নতুন নেতৃত্বের কাছে সংস্থাটির পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

‘চেয়ার এমেরিটাস’ হিসেবে তিনি ব্র্যাকের কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকবেন। আগামী দিনগুলোতে ব্র্যাকের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা ও বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব ও অবস্থান কীভাবে আরো শক্তিশালী করা যায় তা নিয়ে কাজ করবেন তিনি।”

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ১৯৭২ সালে ব্র্যাকের কাজ শুরু করেছিলেন। এরপর এশিয়া, আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্র্যাক ইন্টান্যাশনাল নামে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এই সংস্থাটি। আবেদের কর্ম দক্ষতায় ব্র্যাক এখন বিশ্বের ‘সর্ববৃহৎ’ এনজিও হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৭২ সালে ৩৬ বছর বয়সে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন ফজলে হাসান আবেদ। ৬৫ বছর বয়সে নির্বাহী পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁকে চেয়ারপারসন নির্বাচিত করে ব্র্যাকের তৎকালিন পরিচালনা পর্ষদ। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধায়ক পর্ষদেরও চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

গত সপ্তাহে ব্র্যাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান আসিফ সালেহ। তিনি ইতোমধ্যে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে গত মে মাসে যোগ দেন মুহাম্মাদ মুসা। তারা সংস্থার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছেন।

অনুষ্ঠানে ফজলে হাসান আবেদ বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর আমি ব্র্যাকে আমার পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে অনেক ভেবেছি এবং সেই মতো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন আমার বয়স ৮৩ বছর। ব্র্যাককে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কাজে যথাযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি ছিল আমার সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গর্ব এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, যাতে আমার অবর্তমানেও ব্র্যাক তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারে।’

আবেদ আরো বলেন, ‘ব্র্যাক কখনোই আমি বা কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। আমি এর প্রতিষ্ঠাতা ঠিকই, কিন্তু ব্র্যাকের সুদৃঢ় ভিত্তি ও সুনাম তৈরি করেছেন এর নিবেদিত কর্মীরা, তাঁদের প্রত্যয় ও কর্মনিষ্ঠা দ্বারা। তিনি বলেন, “আমি স্বপ্ন দেখি, ব্র্যাক আগামীতে আরও বড় হয়ে উঠবে, নতুন উদ্ভাবন চালিয়ে যাবে, নতুন দিনের প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে নতুন সমাধান নিয়ে।”

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ছোট্ট একটি ত্রাণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন ফজলে হাসান আবেদ। গত ৪৭ বছরে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১১ কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে ব্র্যাক পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং কার্যকর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের ১১টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে সংস্থাটির কার্যক্রম। এছাড়াও, ব্র্যাকের অ্যাফিলিয়েট কার্যালয় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন বিশেষ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্বাবলম্বী করার প্রয়াসে বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি (ব্র্যাক) নামে ব্র্যাকের কাজ শুরু হয়। গণশিক্ষা থেকে শুরু করে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের মতো কাজের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয় ব্র্যাকের কার্যক্রম।

১৯৮০ সালে ম্যাগসেসে পুরস্কার পাওয়ার পর জীবনে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন ফজলে হাসান আবেদ। তার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার, স্পেনিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট, লিউ টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল ইত্যাদি। ২০১৪ ও ২০১৭ সালে ফরচুন ম্যাগাজিনের নির্বাচিত ৫০ বিশ্বনেতার মধ্যে ফজলে হাসান আবেদের নাম স্থান পায়।

ফজলে হাসান আবেদের জন্ম ১৯৩৬ সালে। তিনি পড়াশোনায় উচ্চতর ডিগ্রি নেন লন্ডনে, হিসাব বিজ্ঞানে। পড়াশোনার পর তিনি একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পাকিস্তান শাখায় যোগ দিলেও, ১৯৭০ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বদলে দেয় তাঁর জীবন। চাকরি ছেড়ে তিনি চলে যান লন্ডনে, সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত গঠনে কাজ করেন। এরপর ১৯৭২ সালে দেশে ফিরেই দেশ পুনর্গঠনের জন্য ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করে কাজ শুরু করেন ফজলে হাসান আবেদ।

Print Friendly, PDF & Email