বাঙালিনিউজ
প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে আজ ০২ জুন ২০১৯ রোববার বেলা ৩টা ৪৮ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ফাইল ফটো

বাঙালিনিউজ
নিজস্ব প্রতিদেক

অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ আর নেই। এই প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে আজ ০২ জুন ২০১৯ রোববার বেলা ৩টা ৪৮ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর ভাগনে শাহরিয়ার মাহমুদ প্রিন্স মিডিয়াকে খবরটি নিশ্চিত করেছেন।

১৯৩৫ সালের ১৮ই জানুয়ারি মমতাজউদদীন আহমেদের জন্ম মালদহে, যা বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত। দেশ বিভাগের পর তার পরিবার তদানীন্তন পূর্ববঙ্গে চলে আসে। মমতাজউদদীন আহমেদের মাতার নাম সখিনা বেগম এবং পিতার নাম কলিমুদ্দিন আহম্মদ। মমতাজউদদীন আহমদ অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।

তিনি মালদহ আইহো জুনিয়র স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ১৯৫১ সালে ভোলাহাট রামেশ্বর পাইলট মডেল ইনস্টিটিউশন থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। রাজশাহী সরকারি কলেজে পড়ার সময়ই রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি।

রাজশাহীর তৎকালীন ছাত্রনেতা ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপুর সান্নিধ্যে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগঠনে তিনি ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী সরকারি কলেজের মুসলিম হোস্টেলের ইট কাদামাটি দিয়ে যে শহীদ মিনার গড়ে উঠেছিল, তাতে মমতাজউদ্দীনও ভূমিকা রেখেছিলেন। তখন জেল খেটেছেন একাধিকবার।

অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ বেশ কয়েক দিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা তাঁকে আইসিইউতে রাখার পরামর্শ দেন। এর আগে তিনি একাধিকবার লাইফসাপোর্ট থেকে ফিরে এসেছিলেন। তবে এবার আর ফেরা হয়নি।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মমতাজউদদীন আহমদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে আজ ২ জুন রোববার মাগরিবের নামাজের পর গুলশান আজাদ মসজিদে। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে মিরপুরের বাসায়। আগামীকাল ৩ জুন সকালে দ্বিতীয় জানাজা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে। এরপর মমতাজউদদীন আহমদের মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট গ্রামে।

মমতাজউদদীন আহমদের ঘনিষ্ঠজন অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী জানান, গত ১৬ মে থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এই নাট্যজন। দুদিন আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তার শরীরও অক্সিজেন পাচ্ছিলো না। শরীরের ভেতর কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হয়ে যাচ্ছিলো। মস্তিষ্কেও পানি জমে গিয়েছিল।

অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনি। কাজ করেছেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। এক অঙ্কের নাটক লেখায় বিশেষ পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে নাট্যকার হিসেবে একুশে পদকে ভূষিত হন।

অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। এক অঙ্কের নাটক লেখায় বিশেষ পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি কলেজে ৩২ বছর বাংলা ভাষা সাহিত্য এবং বাংলা ও ইউরোপীয় নাট্য বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৭৬-৭৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৭-৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন।

তার লেখা নাটক ‘কী চাহ শঙ্খচিল’ এবং ‘রাজার অনুস্বারের পালা’ কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল। নাট্যচর্চায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৭ সালে একুশে পদক পান। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন।

তার রচিত নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘নাট্যত্রয়ী’, ‘হৃদয়ঘটিত ব্যাপার স্যাপার, ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘জমিদার দর্পণ’, ‘সাত ঘাটের কানাকড়ি’। নিয়মিত চিত্রনাট্য রচনা ছাড়াও তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশের নাটকের ইতিবৃত্ত’, ‘বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিবৃত্ত’, ‘নীলদর্পণ’ (সম্পাদনা), ‘সিরাজউদ্দৌলা’ (সম্পাদনা)।

মমতাজউদদীন তার নাটকের মধ্য দিয়ে দেশ, দেশের মানুষ ও বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছেন। চলতি বছর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদের ৮৫তম জন্মদিন উদযাপন করা হয়েছে, বাংলা একাডেমিতে। সেখানে আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে “উনি বলতেন, একটা মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। এই মুক্তিযুদ্ধ অসাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধাপরাধ, অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে, বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে। সেই লড়ইয়ের শুরু থেকে অধ্যাপক মমতাজউদদীন স্যার আমাদের চেতনার বাতিঘর হয়ে আছেন।”

এবার বাংলা একাডেমিতে তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ভাষা সৈনিক কামাল লোহানী বলেন, “২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে যে স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছিল সেটার বাংলা অনুবাদ করে দিয়েছিলেন অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ। স্বৈরাচারী এরশাদের সময়ে রওশন এরশাদের সামনেই স্বৈরাচারবিরোধী নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।”

Print Friendly, PDF & Email